চিত্রনাট্য অথবা দৃশ্যগল্পঃ পরবাসী মন

চিত্রনাট্যঃ পরবাসী মন

সবুজ ওয়াহিদ

 

দৃশ্য ১ + ১ক

মালয়শিয়ায় রুবেল-আনিসের ঘর + গ্রামে রুবেলের ঘর। রাত। রুবেল, আনিস, জামিল + ময়না, মা।

 

মেস টাইপের একটা ঘরে আনিসের মোবাইলে গান বাজছে– অঞ্জন দত্তের কাঞ্চনজঙ্ঘা (একটু ভালো করে বাঁচবো বলে আর একটু বেশি রোজগার/ ছাড়লাম ঘর আমি ছাড়লাম ভালোবাসা আমার নীলচে পাহাড়..)। আনিস শুয়ে চোখ বন্ধ করে হাতে ঠুকে গানের সাথে তাল দিচ্ছে। এই সময় রুবেল পাট করে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ঘরে ঢোকে। তার গায়ে রঙচঙে সুন্দর একটা শার্ট। সে এসে দাঁড়ায় আনিসের চৌকির পাশে। বোকার মতো দাঁত কেলিয়ে বলে,

রুবেল :           এ ভাই।

আনিস চোখ খুলে তাকায়।

আনিস :          রেডি?

রুবেল হাসিমুখে দ্রুত উপর-নিচে মাথা দোলায়। আনিস হেসে বলে,

আনিস :          শার্ট তো একখান পরিছাও এক্কেরে নয়া জামাইর লাহান!

রুবেল লাজুক হেসে বলে,

রুবেল :           পুরোনো আর হতি পারলাম কনে রে ভাই! বিয়ের এক মাসের মাথাই তো ভিসাখান লাইগে গেল!

আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লাণ হেসে বলে,

আনিস :          দাঁড়াও, কল দেই ভাবিরে।

আনিস মোবাইলে কাউকে ভিডিও কল করে। রুবেল তাড়াতাড়ি একটা সানগ্লাস চোখে দেয়। আনিস মোবাইলটা দেয় রুবেলের হাতে।

 

গ্রামের ঘরে ময়না চৌকির উপর রাখা মোবাইলের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে বসে আছে। মোবাইলে কল আসে। ময়না তাড়াতাড়ি কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইল রিসিভ করে। মনিটরে রুবেলের পাশে আনিসকে দেখে তাড়াতাড়ি লম্বা ঘোমটা টানে ময়না।

 

রুবেল হাসে ময়নার এমন কা- দেখে।

রুবেল :           ও কী করতিছাও ময়না! উনি তো আনিস ভাই। উনারে দেইখে অতো লম্বা ঘোমটা দিতিছো ক্যান?

ময়না মৃদু স্বরে বলে,

ময়না :            আমার শরম করে!

রুবেল কিছু বলতে যায়। তার আগেই আনিস রুবেলের কাঁধে হাত রেখে বলে,

আনিস :          তুমি কথা কও। আমি একটু বাইরের থে হাওয়া খায়ে আসি।

বলে আনিস বেরিয়ে যায়। আনিস বেরিয়ে যেতেই রুবেল দরজার কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে আসে আনিস গেছে কি না। তারপর তাড়াতাড়ি ফিরে এসে বলে,

রুবেল :            আনিস ভাই চইলে গেছে! ও ময়না, এইবার চেহারাডা এট্টু দেহাও।

ময়না ঘোমটা সরিয়ে তাকায়। রুবেলের মুখে মুগ্ধতার হাসি। এই সময় ময়নার ঘরে আসে রুবেলের মা।

মা :                  ও বউমা, আমার রুবেইল্যা ফোন করিনি আইজকে!

ময়না :            হ মা। এই তো কথা কচ্ছে। নেন কথা কন।

ময়না মায়ের হাতে ফোন দেয়।

রুবেল :           সালামালেকুম মা।

মা :                  অলঅইকুম আস সালাম। অ রুবেল, কখন ফোন করিছিস বাপ?

রুবেল :           এই তো মা.. ইট্টু আগে।

মা তাকায় ময়নার দিকে। রাগত স্বরে বলে,

মা :                  তুমার আক্কেল জ্ঞান কবে হবে কউ দি বউমা! ছাওয়ালডা সেই কতক্ষণ আগে ফোন করিছে!  আর তুমি আমারে একবার ডাকলাও না!

ময়নার মুখ কাঁচুমাচু হয়। রুবেল তাড়াতাড়ি বলে,

রুবেল :           বেশিক্ষণ আগে ফোন করিনি মা! এই তো ইট্টু আগেই করলাম!

মায়ের মুখে হাসি ফোটে।

মা :                  তোর মুখখান তো শুকনো দেখা যাচ্ছে! রাইতে কি খাইয়েছিস বাপ?

রুবেল :           হ মা। রুটি, গরুর কলিজা ভুনা, জাম আর বিদেশী ফলের শরবত।

মা :                  রাইতের বেলা রুটি খাতি দেচ্ছে! ও খাইয়ে কী পেট ভরে রে বাপ!

রুবেল :           আরে মা কী কচ্ছো তুমি! এই রুটি ওই আমাগে দেশের চিমসে মার্কা রুটি না! এই রকম  বড় বড় আর সেই রকম নরম তুলতুলা! মুখের মদ্যি দিলি একদম মাখনের লাহান গইলে যায়! দুই মাস পরে যহন আসপানে তহন তুমাগে জন্যি নিয়ে আসপানে। খাইয়ে দেইহেনে!

মা চিন্তিত মুখে বলে,

মা :                  দুই মাস পরে কি আসতে পারবিনি বাপ! জামিলির টাহা-পয়সা কি শোধ হবে নে?

রুবেলের মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে। তবে সে তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে হেসে বলে,

রুবেল :           ও হইয়ে যাবে নে! বেতন ঠেতন তো সেইরাম পাচ্ছি। কাজটাও জবর! হোটেলে বইসে শুধু এরে এ কর তারে তা কর কই। আর সব তামিল হইয়ে যায়। আমি মনে করো এইখেনে পিরায় রাজা!

এই সময় রুবেলের ঘরের দরজায় কেউ ধাম ধাম করে থাবা দেয়।

জামিল :          (অফভয়েস) রুবেল.. অয় রুবেল!

রুবেল তাড়াতাড়ি ফোনে বলে,

রুবেল :           ওই যে জামিল ভাই ডাকতিছে! নাইট শিফটের কাজ শুরু করতি হবে!

মা :                  রাইতের বেলাও কাজ করবি বাপ! ঘুমাবি কখন?

রুবেল হেসে বলে,

রুবেল :           মাত্র দুই ঘন্টা করবানি! তারপর আইসে ধরো টানা ঘুম! এহন তালি রাখতিছি মা। সালামালায়কুম।

মা :                  ওয়ালায়কুম আস সালাম বাপ। সাবধানে থাকিস।

রুবেল ফোন কেটে দেয়। মা বিরক্ত দৃষ্টিতে ময়নার দিকে তাকিয়ে ফোনটা তার হাতে দিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ময়না বিমর্ষ চেহারায় ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

 

রুবেল তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খোলে। এই প্রথম দেখা যায় তার রঙচঙে শার্টের নিচে একটা ময়লা হাফপ্যান্ট পরা। দরজা খুলতেই জামিল খেঁকিয়ে ওঠে,

জামিল :          কতক্ষণ ধইরে ডাকতিছি রুবেল মিঁয়া! কোন সাড়া শব্দ নেই!

রুবেল :           ইট্টু ঘুমোয় পড়িছিলাম জামিল ভাই!

জামিল :          তা তো ঘুমোবাই! বিদেশে নিয়াইছি! তুমাগে তো খালি সুখ আর সুখ! একজন ঘুমোচ্ছে,  আরেকজন ছাদে বইসে সিগারেট টানতিছে! তা রাইতের শিফট করবে কিডা সেইডে কি ঠিক করিছো কিছু?

রুবেল :           আমি.. আমিই করবো জামিল ভাই! এই যে আসতিছি।

জামিল :          হ.. তাড়াতাড়ি আসো! খুব গন্ধ বেরোচ্ছে!

বলেই জামিল গটগট করে চলে যায়। রুবেল আনিসের চৌকির উপরে পড়ে থাকা মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

 

দৃশ্য ২

কোন বড় হোটেলের ওয়াশরুম। রাত। রুবেল, অন্যান্য।

 

রুবেল ওয়াশরুম পরিস্কার করছে। লোকজন আসা যাওয়া করছে। রুবেলর হাফপ্যান্ট আর রঙচঙে শার্ট দেখে হাসাহাসি করছে। রুবেলের এসব দিকে কোন মনোযোগ নেই। সে নিজের মনে কাজ করে চলেছে।

 

দৃশ্য ৩

রুবেল-আনিসের ঘর। দিন। রুবেল, আনিস।

 

আনিস শুয়ে শুয়ে মোবাইলে গান শুনছে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নীল আকাশের নিচে এই পৃথিবী আর পৃথিবীর পরে ওই নীলাকাশ তুমি দেখেছো কি…? রুবেল ক্লান্ত ভঙ্গিতে দরজা ঠেলে ঢোকে। ঘরের মেঝেতে একগাদা সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে। রুবেল সিগারেটের গন্ধে নাক কুঁচকায়। নির্ঘুম আনিসের দিকে তাকিয়ে বলে,

রুবেল :           ঘুমান নাই আনিস ভাই?

আনিস তাকায় রুবেলের দিকে। ক্লান্ত স্বরে বলে,

আনিস :          গেরামে কী খুব কষ্টে আছিলা রুবেল মিঁয়া?

রুবেল ম্লাণ হাসে।

আনিস :          আমাগো কোন কিছুর অভাব আছিলো না বুঝলা। এক ছেঁড়িরে মন দিছিলাম! হ্যায় মনডারে ভাইঙ্গা চুইরা এমন হাল করলো! সব ছাইড়া-ছুইড়া চইলা আসলাম এইহানে।

রুবেল :           আবার ফিরা যান।

আনিস উঠে বসতে বসতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,

আনিস :          নাহ! দশ বছর গেছে গা! আর মন টানে না!

রুবেল খুশি খুশি গলায় বলে,

রুবেল :           কয় মাস পরে আমার দাদনের টাকা শোধ হইবো। তারপর এক ঘুল্লি যামু দ্যাশে।

আনিস হাসে।

আনিস :          যাইও। তুমি আহনে খুব ভালা হইছে। কতদিন পর নিজের গেরামের ভাষায় কথা কইতে পারতেছি।

রুবেল কী বলবে বুঝতে পারে না। ক্যাবলার মতো হাসে।

আনিস :          ঘরের যেই অবস্থা করছি! তুমি তো মিঁয়া..

রুবেল :           এইসব নিয়া আপনে ভাইবেন না তো। আপনে কামে যান। আমি এক ফুঁ দিয়া সব ক্লিয়ার কইরা ফালাইতেছি।

আনিস উঠে রুবেলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়। রুবেল ঘর পরিস্কার করতে লেগে যায়।

 

দৃশ্য ৪

রুবেলরে গ্রামের বাড়ির উঠান। দিন। ময়না, মা।

 

ময়না পানির কলস নিয়ে আসছে। মা রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত। আচমকা ময়নার মাথা যেন টলে ওঠে। তার কাঁখ থেকে পড়ে যায় পানির কলস। মা রান্নাঘর থেকে খেঁকিয়ে ওঠে,

মা :                  কী.. ননীর পুতুলের আবার হইলো কী?

ময়না ছুটে যায় আড়ালে। ওয়াক ওয়াক করে বমি করতে থাকে। মায়ের মুখে হাসি ফোটে। সে অ¯ফুটে বলে,

মা :                 পোলায় আমার মরদের লাহান মরদ!

 

দৃশ্য ৫

রুবেল-আনিসের ঘর। দিন। রুবেল, জামিল।

 

রুবেল হাঁ করে ঘুমাচ্ছে। জামিল দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে। রুবেলকে ঘুমাতে দেখে তার যেন রাগে শরীর জ্বলে যায়। তবে সে তাড়াতাড়ি মুখে হাসি টেনে গিয়ে বসে রুবেলের পাশে। আলতো করে ধাক্কা দেয় রুবেলকে।

জামিল :          রুবেল ভাই। ও রুবেল ভাই!

রুবেল ধড়মড় করে উঠে বসে।

রুবেল :           ক.. কী.. কে?

জামিল :          না, না কেউ না। আমি। আমি।

রুবেল চোখ ডলে।

রুবেল :           কী হইছে জামিল ভাই?

জামিল :          বলতেছিলাম কী.. তুমি কি আমার গাড়িটা একটু পরিস্কার করে দিতে পারবা ভাইয়া!

রুবেল অবাক জামিলের মুখে এমন কথা শুনে।

রুবেল :           গাড়ি পরিস্কার করতে হবে সেইটা আপনি এইভাবে বলতেছেন কেন জামিল ভাই!

জামিল :          না, মাইনে তোমারে তো আনছি হোটেলে কাম করানোর কথা বইলা। এখন যদি আমার পার্সোনাল কোন কাজ করতে তুমি না চাও.. তাই আর কী!

রুবেল হাসে।

রুবেল :           আরে কী যে কন! আপনের কাজ মানেই তো আমার কাজ। কোথায় গাড়ি.. বলেন?

জামিলের মুখে হাসি ফোটে।

 

দৃশ্য ৬

কার পার্কিং। দিন। রুবেল, আনিস, রুবা।

 

রুবেল মনের আনন্দে গাড়ি পরিস্কার করছে আর গুন গুন করে গান গাচ্ছে। আনিস আর রুবা কথা বলতে বলতে আসে। রুবেলকে গাড়ি পরিস্কার করতে দেখে অবাক হয় আনিস।

আনিস :          রুবেল! এইটা কী করতেছো তুমি?

রুবেল হেসে বলে,

রুবেল :           কাম করতেছি আনিস ভাই!

আনিস :          এইটা তো জামিলের গাড়ি! এই গাড়ি তুমি ক্যান পরিস্কার করতেছো? জামিল এই কাজ করতে বলছে তোমাকে?

রুবেল:            হ্যাঁ.. মাইনে না.. মাইনে..!

আনিস শক্ত স্বরে বলে,

আনিস :          ডিডের বাইরে কোন কাজ করবা না বুঝছো। সারাদিন সারা রাত তোমারে খাটাইতেছে!  আবার নিজের কাজও করাইতেছে! পুলিশের কাছে গেলে ওরে চৌদ্দশিকের ভেতরে ভইরা রাখবে!

রুবেল :           আরে না, না! কী কন এইগুলা আনিস ভাই! জামিল ভাই তো আমাদের গেরামেরই লোক।  আমারে কতো কষ্ট কইরা এইদেশে নিয়াসছে!

আনিস :          ঘোড়ার ডিমের কষ্ট! তুমি টাকা দিছো না?

রুবেল :           অহনতরি সব দিতে পারি নাই আনিস ভাই!

আনিস :          দিতে পারো নাই.. দিবা। তোমার বেতন থিকা টাকা কাটবে! কিন্তু ভুলেও এই সব আর করবা না! এর সাথে পরিচিত হও। এর নাম রুবা। আমাগো দ্যাশেরই মেয়ে। পাশের হোটেলে নাচে। আর রুবা, এ হচ্ছে রুবেল। আমার সাথেই থাকে।

রুবেল হতভম্ব ভাবে তাকিয়ে থাকে আল্ট্রা মর্ডান রুবার দিকে। রুবা হেসে হাত বাড়ায় রুবেলের দিকে। রুবেল তাড়াতাড়ি হাত মেলায় রুবার সাথে।

রুবা :               নাইস টু মিট ইউ।

রুবেল :           হেঃ হেঃ হেঃ! আপনেরে আমি বিদেশী মেম ভাবছিলাম!

রুবা হাসে।

আনিস :          চলো, আমাদের সাথে কফি খাবা।

রুবেল :           এই কামটা শেষ কইরা আসি?

আনিস :          ধুর মিঁয়া, তোমারে এতোক্ষণ কী বুঝাইলাম আমি!

রুবেল কাঁচুমাচু করে বলে,

রুবেল :           জামিল ভাই আমার বড় ভাইয়ের লাহান।

আনিস :          করো.. তোমার যা খুশি করো! এতে করে তোমাকে শুধু খাটাবে। এর বেশি কিছু হবে না।

রুবেল হাসে।

আনিস :          চলো রুবা, আমরা যাই।

রুবা রুবেলকে বলে,

রুবা :               ওকে। আবার দেখা হবে।

রুবেল :           জ্বে.. জ্বে.. অবশ্যই হইবো!

আনিস আর রুবা যেতে শুরু করে। রুবেল একটু সময় সেদিকে তাকিয়ে থেকে আবার গান গাইতে গাইতে গাড়ি মুছতে শুরু করে।

আনিস আর রুবা একটু সরে আসার পর রুবা বলে,

রুবা :              লোকটা খুব সরল বলে মনে হলো!

আনিস হেসে বলে,

আনিস :          হ্যাঁ। একটু বেশিই সরল।

 

দৃশ্য ৭ + ৭ক

রুবেল-আনিসের ঘর + গ্রামে রুবেলের ঘর। রাত। রুবেল + মা, ময়না।

 

লজ্জা লজ্জা মুখে থাকা রুবেলের হাতে ধরা মোবাইলের মনিটরে মায়ের খুশি খুশি মুখ।

মা :                  নাতি হইলে নাম রাখমু সোহেল। আর নাতিন হইলে টিয়া।

রুবেল :           আচ্ছা রাইখো। ময়নারে একটু দেও।

মা হাসিমুখে বলে,

মা :                  ক্যান মায়ের সাথে কথা বলতে আর ভাল্লাগতেছে না?

রুবেল :           কী যে কও না মা! সালামালায়কুম।

মা হাসে।

মা :                  ওয়ালায়কুম আস সালাম। শোন, পারলে কিছু টাকা পাঠাইস। মানুষজনেরে মিষ্টিমুখ করাইতে হইবো। এই যে নে বউমার লগে কথা ক। নেও বউমা।

মা ময়নার হাতে ফোনটা দিয়ে হাসিমুখে বেরিয়ে যায়।

রুবেল :           কেমন আছো গো আমার টিয়ার মা?

ময়না :            আপনি কি ধইরাই নিছেন মাইয়া হইবো?

রুবেল :           হ হইবো। মাইয়া হইতেছে বাপ সোহাগী। আইজ কাছে থাকলে যে তোমারে আমি কী  করতাম না!

ময়না :            কী করতেন?

রুবেল :           তোমার চোখে কাজল দিয়া দিতাম। কপালে টিপ পরায়া দিতাম। চুলে বেনী কইরা দিতাম। হাতে কাঁচের চুড়ি পিন্দায়া একখান সবুজ শাড়ি পরায়া তোমারে নিয়া গিয়া পুকুর ঘাটে সারা রাত বইসা থাকতাম।

ময়না :            এইসব কথা কন.. আপনের শরম করে না!

রুবেল :           না করে না। উফ!

ময়না :            কী হইলো?

রুবেল :           না কিছু না। হাতে একটু লাগছে।

ময়না :            তাইলে ফোন রাইখা হাতে সেঁক দেন।

রুবেল :           না, না.. শোনো শোনো..।

ময়না :            শুনমু না। আগে হাতে সেঁক দেন!

বলে ময়না ফোন কেটে দেয়।

 

রুবেল ফোনটা পাশে নামিয়ে রেখে একটা পা তুলে দেখে বুড়ো আঙুলে কামড় দিয়েছে ইঁদুর। রক্ত ঝরছে। রুবেল নিচু হয়ে ইঁদুরটাকে খুঁজতে থাকে।

রুবেল :           হালার উন্দুর! তোমারে একবার পাইলে খবর আছে!

 

দৃশ্য ৮

গ্রামে রুবেলের ঘর + পুকুর ঘাট। রাত। ময়না।

 

ময়না সবুজ শাড়ি পরে যতœ করে চোখে কাজল মাখে। চুলে বেনি করে। হাতে চুড়ি পরে। কপালে টিপ দেয়। তারপর পুকুর ঘাটে গিয়ে বসে হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে।

 

দৃশ্য ৯

হোটেলের ওয়াশরুম। রাত। রুবেল, অন্যান্য।

 

রুবেল ওয়াশরুম পরিস্কার করছে। একজন তাকে কিছু টাকা টিপস দেয়। রুবেলের মুখে হাসি আর ধরে না।

 

দৃশ্য ১০

জামিলের অফিসরুম। দিন। জামিল, রুবেল।

 

জামিল নিজের চেয়ারে বসে ফোনে কারো সাথে কথা বলছে।

জামিল :          এইটা তো খুবই সুসংবাদ। এইবার কিন্তু পোলা চাই! জ্যান্ত। নাইলে কিন্তু তালাক পাক্কা। কথাডা মনে রাইখো!

রুবেল দরজা ঠেলে উঁকি দেয়।

রুবেল :           ভাই, আমু?

জামিল ইশারায় রুবেলকে আসতে বলে ফোনে বলতে থাকে।

জামিল :          না, না চিন্তা কইরো না! আইজকাই পাঠায়া দিমু। ডাক্তার-ডুক্তার যা যা লাগে সব দেহাও। অহন রাখলাম। রাইতে কথা বলবোনে।

জামিল ফোন নামিয়ে তাকায় রুবেলের দিকে। রুবেল হাসি হাসি মুখ করে বলে,

রুবেল :           দ্যাশে টাকা পাঠাইতে হয় ক্যামনে জামিল ভাই?

জামিলের ভুঁরু কুঁচকে যায়। সে একটা খাতা বের করে দেখতে থাকে।

রুবেল :           নিয়ম-কানুন কী ওই খাতায় ল্যাখা আছে?

জামিল তাকায় রুবেলের দিকে।

জামিল :          না। এইহানে লেখা আছে আমি অহনো তোমার কাছে দেড় লাখ টাকা পামু। হেই টাকা শোধ না দিয়া তুমি দ্যাশে টাকা পাঠাইতেছো ক্যামনে শুনি!

রুবেল :           ওই টাকা তো আপনে আমার বেতন থিকা কাইটা নিতেছেন। বাকিটা নিতেছেন আমার  খোরপোষ বাবদ। এই টাকাগুলা মাইনষে মাঝে-মইদ্যে খুশি হইয়া আমারে দিছে!

জামিল :          অহন তুমি যদি হেইগুলান আমারে খুশি হইয়া দেও তাইলে তোমার দেনা তাড়াতাড়ি শোধ হয় না? তুমি তাড়াতাড়ি বেতন পাইতে পারো না? বাড়িতে পাঠাইলে বেতনের টাকা পাঠাইবা মিঁয়া। নিজের কষ্ট কইরা ইনকাম করা টাকা পাঠাইবা! মাইনষের দেয়া টাকা পাঠাইবা ক্যান? দেও টাকাগুলা আমারে দেও।

রুবেল পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বিমর্ষ মুখে দেয় জামিলের হাতে। জামিল খুশি মনে টাকাগুলো গোনে। তারপর খাতায় কিছু লেখে।

জামিল :          তোমার কাছে আমার পাওনা থাকলো আর এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার টাকা মাত্র! বুঝছো?

রুবেল :           জ্বে।

জামিল :          যাও.. এখন মন দিয়া কাম করো।

রুবেল ঘুরে বেরিয়ে যায়। জামিলের মুখে ধূর্ত হাসি ফোটে।

জামিল :          হালার বলদা!

 

দৃশ্য ১১

গ্রামের বাজারে সোনার দোকান, মিষ্টির দোকান, গ্রামে রুবেলের বাড়ির উঠান। দিন। মা, ময়না, অন্যান্য।

 

মন্তাজ শটে দেখা যায়–

ক.       সোনার দোকানে নিজের হাতে থাকা পাতলা একটা চুড়ি খুলে বিক্রি করছে মা। তার চোখ ছলোছলো।

খ.        মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টির প্যাকেট হাতে বের হচ্ছে মা।

গ.        বাড়ির উঠানে হাসিমুখে মানুষদের মধ্যে মিষ্টি বিলাচ্ছে মা। সবার শেষে সে ময়নার মুখের কাছে  একটা মিষ্টি ধরে।

মা :                  নেও মা, মিষ্টিমুখ করো।

ময়না :            কামডা না করলেও পারতেন মা! আব্বাজানের শেষ স্মৃতি!

মা শক্তমুখে বলে,

মা :                  ভুলেও এই কথা আমার রুবেলরে বলবা না! ও মনে কষ্ট পাইবো। নেও, এখন হাসিমুখে মিষ্টি খাও।

ময়না ভেজা চোখে মিষ্টিতে একটু কামড় দেয়। মা হাসিমুখে বাকিটুকু নিজের মুখে পোরে।

 

দৃশ্য ১২

রুবেল-আনিসের ঘর। রাত। রুবেল, আনিস।

 

রুবেলের জ্বর এসেছে। আনিস তার মাথায় জলপট্টি দিতে দিতে বলছে,

আনিস :          তোমাকে ইঁদুরে কামড়েছে আর তুমি সেটা আমাকে বলো নাই! এখন যদি প্লেগ-টেøগ  হয়ে যায়!

রুবেল জ্বরের ঘোরে বলে,

রুবেল :            কিচ্ছু হইবো না ভাই! আমার মায়ের দোয়া আমার লগে আছে।

আনিস :          থাকলেই ভালো!

রুবেল :           আইজ কি পূর্ণিমানি ভাই! চাইরদিক এতো আলো আলো ঠ্যাকে কেন?

আনিস :          কী জানি! এই দ্যাশে পূর্নিমা-টুর্নিমা নিয়া অতো কেউ মাথা ঘামায় না! চাইরদিকে এমনেই  সব সময় আলো থাকে।

রুবেল :           জানেন, আমার না পূর্ণিমা-আমাবশ্যা খুব দ্যাখতে হইতো ভাই। আমার মায়ের বাঁতের বেথা। পূর্নিমা-আমাবশ্যায় বেথা বেশি বাড়ে। আমি মায়ের পাও টিপা দিতাম।

আনিস :          রুবেল, একটু চুপ কইরা ঘুমাও তো ভাই। তাড়াতাড়ি সুস্থ হইতে হইবো। কাইলকা তোমারে  নিয়া গিয়া টিটিনাস দিয়া নিয়াসবো।

রুবেল :            ভাই.. আইজ খালি মায়ের কথা মনে পড়তেছে ভাই!

আনিস :          ঘুমাও রুবেল.. একটু ঘুমাইতে চেষ্টা করো।

আনিস রুবেলের মাথায় জলপট্টি দিতে থাকে।

 

দৃশ্য ১৩

মায়ের ঘর। রাত। মা, ময়না, রুবেল।

 

মা বিছানায় শোয়া। ময়না মায়ের পা টিপে দিচ্ছে।

মা :                  তুমি পোয়াতি মেয়েছেলে! এতো রাইত জাগতেছো কেন? যাও, গিয়া ঘুমাও।

ময়না :            আপনের শরীরডা ভালো আম্মা! আইজ মাথা ঘুইরা পইড়া গেছিলেন। আমি থাকি আপনার  কাছে।

মা :                  না। আমি তোমারে যেইটা বলছি সেইটা করো। আর রুবেল ফোন দিলে আমার শরীর খারাপের কথা কিছু ওরে বলবা না বুঝলা। যাও।

ময়না উঠে অনিচ্ছার ভঙ্গিতে বেরিয়ে যায়। মা তাকিয়ে থাকে শুন্য দরজার দিকে। তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়। সে দেখে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে রুবেল। মা উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,

মা :                  বাপজান আসছো!

মা উঠে বসতে যায়। পারে না। রুবেল তাড়াতাড়ি এসে ধরে মাকে। শুইয়ে দেয়। তারপর মায়ের পা টিপে দিতে থাকে। মা আরাম পেয়ে চোখ বন্ধ করে। ঘুম ঘুম স্বরে জড়ানো গলায় বলে,

মা :                  নাতি হইলে অবশ্যই নাম রাখবা সোহেল। আর নাতনি হইলে টিয়া। মনে থাকবে তো?

রুবেল :           জ্বে আম্মা থাকবে।

মা :                  আমার কিন্তু মনে হইতেছে নাতনিই হইবো।

বলতে বলতে মা খুশিমুখে ঘুমিয়ে পড়ে।

 

দৃশ্য ১৪

মায়ের ঘর। দিন। মা, ময়না।

 

মা ঘুমিয়ে আছে। ময়না এসে ডাকে।

ময়না :            আম্মা.. ওঠেন আম্মা। অনেক বেলা হইছে।

মা ওঠে না। মায়ের কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে ময়না মাকে একটু ধাক্কা দেয়।

ময়না :            আম্মা ওঠেন।

মায়ের শরীর গড়িয়ে কাত হয়। মা মারা গেছে। ময়না কিছুক্ষণ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করে।

 

দৃশ্য ১৫

মালয়শিয়ায় কবরস্থান। দিন। রুবেল, আনিস, টিয়া।

 

রুবেল পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে বিভিন্ন কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে আর কবর জিয়ারত করছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে বেদনাহত মুখে এই দৃশ্য দেখতে থাকা আনিস রুবাকে বলে,

আনিস :          আমি আর এইখানে থাকবো না রুবা। অন্য কোন শহরে চলে যাবো। তুমি যাবে আমার সাথে।

রুবা কান্নাভেজা মুখে হ্যাঁ-সুচক মাথা দোলায়।

 

দৃশ্য ১৬

জামিলের অফিসরুম। দিন। জামিল, রুবেল।

 

জামিল ছদ্ম দুঃখের অভিনয় করে সামনে দাঁড়ানো রুবেলকে বলছে,

জামিল :          তোমার আম্মা মারা গেছে এইটা খুবই দুঃখের সংবাদ। এক কাম করো মিঁয়া। ভিটাখান আমার কাঁছে বেঁইচা দেও। তাইলে তোমার দেনা শোধ হইয়া যাইবো। তুমিও আমার কাছ থেইকা তোমার পাসপোর্ট খান নিয়া দ্যাশে ফিরা যাইতে পারবা।

রুবেল :           ভিটা ব্যাঁচলে ময়না থাকবো কই?

জামিল :          ক্যান.. ওর বাপের বাড়ি গিয়া থাকবে। তুমিও দ্যাশে ফিরা ঘরজামাই থাকবা। অবশ্য তারা  যদি তুমারে রাখে আর কী!

রুবেল :           ভিটা আমি বেঁচমু না জামিল ভাই! এ্যার থিকা আপনার আরো যতো কাম আছে আমারে  দেন। আমি দিন রাইত এক কইরা কাম করমু.. আপনের দেনা শোধ করমু।

জামিল :          বুইঝো কিন্তু!

রুবেল :           বুঝমু।

জামিল :          ঠিক আছে। দিতাছি তোমারে কাম।

 

দৃশ্য ১৭

 

মন্তাজ শটে দেখা যায়–

 

ক.       জামিলের বাজার বইছে রুবেল।

খ.        পাথর ভাঙছে রুবেল। ঘেমে নেয়ে একাকার সে। হাতে ব্যথা পায়। দূরে দাঁড়িয়ে হাসে জামিল।

গ.        রুবেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় আনিস আর রুবা। রুবেল একা একা কাঁদে।

ঘ.        অনেক বড় একটা বিল্ডিংয়ের বাইরে ঝুলে ঝুলে জানালার কাঁচ পরিস্কার করছে রুবেল।

ঙ.        রুবেলের দেয়া টাকা হাসিমুখে গুণে নিচ্ছে জামিল।

জামিল :          আর মাত্র দশ হাজার বাকি।

 

দৃশ্য ১৮

জামিলের অফিস রুম। দিন। জামিল, রুবেল।

 

জামিল কানে ফোন ঠেকিয়ে হতভম্ব মুখে বসে আছে।

জামিল :          এইবারো মরা!

জামিল ফোন নামিয়ে রেখে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বসে থাকে। রুবেল দরজা ঠেলে হাসিমুখে বলে,

রুবেল :           ভাই, আমু?

জামিল চোখ তুলে তাকায়। মৃদু মাথা দোলায়। রুবেল খুশি খুশি ভঙ্গিতে তার সামনে এসে মুঠো করা হাত তার দিকে বাড়িয়ে ধরে মুঠো খোলে। রুবেলের মুঠোর মধ্যে কিছু চিনি। জামিল অবাক চোখে তাকায়।

রুবেল :           নেন ভাই, মিষ্টি মুখ করেন! আমার একটা মাইয়া হইছে।

জামিল অবাক চোখে কিছুক্ষণ রুবেলের খুশিমুখের দিকে তাকিয়ে থেকে একটু চিনি নিয়ে মুখে পোরে।

রুবেল :           আইজ যত কাম আছে বইলেন। আমি সব কইরা ফালামু। আইজ আমি অনেক খুশি!

জামিল মৃদু মাথা দোলায়। রুবেল ঘুরে বেরিয়ে যেতে থাকলে জামিল ডাকে।

জামিল :          রুবেল শোনো।

রুবেল ঘুরে তাকায়।

রুবেল :           জ্বে ভাই?

জামিল একটা ড্রয়ার খুলে কিছু টাকা বের করে টেবিলে রাখে।

জামিল :          এই টাকাগুলা নেও। দ্যাশে গিয়া মাইয়ারে দেইখা আসো। এইটা তোমার মাইয়ার জন্য  আমার উপহার।

রুবেলের চোখে অবিশ্বাস।

 

দৃশ্য ১৯

গ্রামে রুবেলের ঘর। দিন। ময়না, বাবু।

 

ময়না বাবুকে কোলে নিয়ে হাঁটছে আর বলছে,

ময়না :            না, না, কান্দে না! আমার টিয়া কান্দে না। বাবা আসতেছে। তোমার জন্য খেলনা নিয়াসবে!

 

দৃশ্য ২০

মালশিয়ার কোন রাস্তায় গাড়িতে। রাত। রুবেল।

 

গাড়ি চলছে। রুবেল গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে হাতে ধরা একটা খেলনা পুতুলের পেটে চাপ দেয়। প্যাঁ পোঁ করে শব্দ হয়। রুবেল মনের আনন্দে হাসে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *