চিত্রনাট্য অথবা দৃশ্যগল্পঃ একজন খারাপ মানুষ

সবুজ ওয়াহিদ

 

দৃশ্য

ঘাট। দিন। মজিদ, আয়েশা, সুমন, অন্যান্য।

 

লম্বা সরু নদী। ঘাটের সিঁড়িতে এসে পানি ছলাত ছলাত করছে। দূর থেকে একটা নৌকা এগিয়ে আসছে। পানিতে পানের পিক গিয়ে পড়ে। পানি লাল হয়ে যায়। নৌকা এসে ঘাটে ভেড়ে। নৌকা থেকে নেমে সুমন আয়েশাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে। মজিদকে প্রথম দেখা যায়।  সে আয়েশাকে দেখে পান খাওয়া দাঁত বের করে হাসে।

 

দৃশ্য

ধনী বাসার ড্রয়িংরুম। দিন। মজিদ, আয়েশা, বাড়ির মালিক আর তার বউ।

 

মজিদ হাসিমুখে বসে আছে ধনী বাসার ড্রইং রুমের সোফায়। তার পাশে মেঝেতে বসে আছে আয়েশা। মজিদের চোখ রাডারের মতো এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে সব কিছু। দেখতে দেখতেই সে চাপা স্বরে আয়েশাকে বলে,

মজিদ :            কথা যা কওনের আমি কমু। তুই শুধু মাথা নাড়বি। বুঝছোস?

আয়েশা মাথা দোলায়। মজিদ চট করে উঠে গিয়ে একটা সুন্দর ছোট শো পিস নিয়ে পকেটে ভরে আবার এসে বসে পড়ে। আয়েশা অবাক।

আয়েশা :         এইটা কী করেন?

মজিদ :            চুপ থাক! তরে না কইছি কথা কবি না, শুধু মাথা নাড়বি। কথা বেশি কইলে এই  শহরে কাম কইরা খাইতে পারবি না। বুঝছোস?

আয়েশা ভয়ে ভয়ে মাথা দোলায়।

মজিদ :            মাসের শুরুতে যখন তরে বেতন দিবো তখন আমি আসমু। আমার কমিশন ঠিকমতো  দিবি। সুমন কইছে না এইগুলা?

আয়েশা আবার মাথা দোলায়। বাড়ির মালিক তার বউকে নিয়ে ঢোকে। মজিদ দ্রুত উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে হাসিমুখে বলে,

মজিদ :            স্লামালেকুম।

বাড়ির মালিক একটু মাথা দোলায়। বসতে বসতে বলে,

মালিক :           এতো দেরি করলে হয় মজিদ মিয়া! একটা কাজের লোকের অভাবে খুবই ঝামেলায়  আছি!

মজিদ হেসে বলে,

মজিদ :            এই যে স্যার নিয়াসছি! ভালো কাজের লোক পাওয়া তো একটু কঠিনই। বোঝেনই তো।

বউ :                 এই মেয়ে কাজকর্ম সব পারে?

মজিদ :            কী কন বেগম আম্মা! পারে না মানে! রান্ধন-বাড়ন, কাপড় ধোয়ন, ঘর পরিস্কার.. সব কাজে এক নম্বর!

বউ :                 চুরিধারির অভ্যাস নেই তো আবার?

মজিদ জিব কাটে।

মজিদ :            ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এই ভাবে আপনে ভাবতে পারলেন! এই মজিদের উপর বিশ্বাস নাই  আপনার! আসলে বলতে হয় না তারপরও বলি, এই মাইয়া ঠিক আর দশটা কাজের  মাইয়া না বেগম আম্মা। আমার বউয়ের দূর স্মপর্কের খালাতো বোন। পরিবারে   টানাটানি.. তাই আমিই কইলাম কিছুদিন শহরে থাইকা কাম করুক। আমার ঘরের মাইয়া আম্মা।

বউ :                 হুমমম। এই মেয়ে চা বানাতে পারো?

আয়েশা মাথা দোলায়।

বউ :                 তাহলে আসো আমার সাথে।

বউটা আয়েশাকে নিয়ে চলে যায়। মজিদ মালিকের দিকে তাকিয়ে হেঃ হেঃ করে হাসতে হাসতে বলে,

মজিদ :            একবার অর হাতের চা খাইলে স্যার আপনে আমার কমিশন বাড়ায়াই দিবেন।

মলিক :            ও হ্যাঁ। তোমার কমিশন।

মালিক পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে মজিদকে দেয়। মজিদ সাথে সাথে থু থু দিয়ে টাকা গুণতে শুরু করে। মালিক উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

মালিক :           চা খেয়ে যেও। আমার একটু কাজ আছে। আমি ভেতরে গেলাম।

মজিদ :            জ্বে।

মালিক চলে যায়। মজিদ টাকা গোনা শেষ করে পকেটে ভরে ঘরের চারপাশে আবার দেখে আবার কিছু একটা নিয়ে পকেটে ভরে।

 

দৃশ্য

চায়ের দোকান। দিন। মজিদ, হাকিম, অন্যান্য।

 

চায়ের দোকানে বসে হাকিম আয়েস করে চা খাচ্ছে। আচমকাই মজিদ এসে কলার চেপে ধরে তার গালে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দেয়। হাকিমের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে যায়। হাকিমের হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে সে হিং¯্র চেহারায় বলে,

মজিদ :            এই মজিদ মিয়ার সুদের টাকা মাইরা দিতে চাস! তর সাবাস দেইখা তো আমি তব্দা  খায়া গেছি রে হাকিম!

হাকিম :           ভ.. ভাই.. মজিদ ভাই! আ.. আমি আগামী হপ্তার মইদ্যেই টাকা দিয়া দিমু!

মজিদ :            আগামী হপ্তা তর হোগার(বিপ) মইদ্যে হান্দায়া দিমু রে মাঙ্গির(বিপ) পুত! দুই দিনের  মইদ্যে সুদের কিস্তি দিবি! নাইলে তর কইলজা কাইটা বাজারে সের দরে বেঁচমু!

হাকিম ভয়ে ঢোঁক গেলে। মজিদ তার কলার ছেড়ে দিয়ে জামার পকেটে হাত দিয়ে যে টাকা পায় সেটা নিয়ে নেয়।

মজিদ :            আপাতত এইডি নিয়া গেলাম! বাকিডার জন্য সময় দুই দিন! কথাডা য্যান মনে  থাকে! অই, ওরে বেশি কইরা দুধ-চিনি দিয়া একটা চা দে।

মজিদ স্লো মোশনে ঘুরে হাঁটা শুরু করে। মুখে একটা পান পোরে।

 

দৃশ্য

পানের দোকান। রাত। মজিদ, দোকানী।

 

দোকানদারের হাত থেকে একটা পান নিয়ে মুখে পোরে মজিদ। আয়েস করে চাবাতে চাবাতে সে চলে যাবার জন্য ঘুরতেই দোকানী বলে,

দোকানী :         ভাই, দাম তো দিলেন না!

মজিদ অবাক চোখে তাকায় দোকানীর দিকে।

মজিদ :            দাম! কীহের?

দোকানী :         ক্যান.. এই যে পান নিলেন.. হেই পানের!

মজিদ ধমকে ওঠে।

মজিদ :            তুই আমার কাছে পানের দাম চাস! এই দোকান করার টাকা তরে কে দিছিলো রে  মাঙ্গির(বিপ)পুত? শোধ দিছোস হেই টাকা?

দোকানী :         জিনিসপত্র নিয়া যদি দাম না দেন তাইলে আপনার টাকা শোধ করমু কই থন?

মজিদ :            কথা বেশি শিখছোস না! মইদ্যে মইদ্যে যে টাকা শোধ করনের টাইম বাড়ায়া দেই  হেইডা খেয়াল থাকে না?

দোকানী :         কিন্তু তার জন্য তো আপনে সুদও বাড়ায়া..

মজিদ :            চোপ! আর একটা কথা কইলে আইজই তর এই দোকান আমি দখলে নিমু! আমার কাছে কিন্তু তর টাকা নেওনের রশিদ আছে।

দোকানী চুপ করে যায়। মজিদ হেসে রেডিওতে গানের ভলিউম বাড়িয়ে দেয়। লেকে পহলা পহলা পেয়ার বাজতে শুরু করে।

 

দৃশ্য

মজিদের বাড়ি। রাত। মজিদ, ময়না।

 

মজিদ আনন্দিত ভঙ্গিতে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে একটা জ্যান্ত মুরগী হাতে নিয়ে ঘরে ঢোকে।

মজিদ :            ও লেকে পেহেলা পেহেলা পেয়ার ভরকে আখো মে খুমার জাদু নগরী সে আয়া হ্যায় কোই জাদুগর.. ওই ময়না কই গেলা?

ময়না বেরিয়ে আসে। মজিদ তার দিকে মুরগী বাড়িয়ে ধরে বলে,

মজিদ :            নতুন আলু দিয়া ঝোল করবা। আর পাখনা, চামড়া এইগুলা ফেইলো না। কাইল  সকালে বাইরানোর সময় ইয়াকুবের দোকানে ফেরত দিবো বলছি। ও এইগুলা ওজন কইরা রাইখা টাকা কিছু ফেরত দেবে।

ময়নার চেহারায় বিরক্তি ভর করে।

ময়না : আপনে এতো খাইষ্টা ক্যান কন তো! মুরগী কিনছেন ভালা কথা। এহন হেইডার চামড়া, পাখনা ফেরত দিয়া আপনের আবার টাকা ফেরত দিতে হইবো!

মজিদ :            হ নিতে হইবো।

ময়না : আপনেরে যে সবাই খারাপ মানুষ কয় হেইডা আপনে শুনেন না?

মজিদ :            দুনিয়াতে পাছে লোকে কিছু কইবোই। হেই সব শুনতে গেলে দিন চলবো না। আর  আ¤্রে যে খারাপ মানুষ কয়.. খারাপের করছিডা কী আমি? মদ খাইছি? জুয়া খেলছি? না তরে অইন্য মাইনষের লগে শোয়ায়া টাকা কামাইছি?

ময়না : ছিঃ। এইসব কী কন আপনে!

মজিদ :            ঠিকই কই। যদি ওইডা করতাম তাইলে তর আর এতো জ্ঞান দেওন আইতো না। এই যে পাকা দালানে থাকোস.. তর চইদ্দ গুষ্টীতে কেউ কোনদিন থাকছে পাকা দালানে? এই দালান করার টাকা কই থেইকা আসে? ভ্যান ভ্যান না কইরা যা কইছি হেইয়া কর।

ময়না মুরগী নিয়ে মুখ গোজ করে থাকে। মজিদ থু থু করে মুখ থেকে পান ফেলে দিয়ে গজগজ করতে করতে ভেতরের দিকে পা বাড়ায়।

মজিদ :            আছে খালি ভ্যান ভ্যান করার তালে! আর ভ্যান ভ্যান করবোও কোনদিন! যেই দিন ঘাট থিকা মনডা ভালা কইরা ঘরে আমু হেইদিন! মনডায় কয়, একখান লাথথি দিয়া মাজাখান ভাইঙ্গা দেই!

মজিদ ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলে সেদিকে তাকিয়ে রাগে কাঁপতে থাকা ময়না চিৎকার করে বলে,

ময়না : ওই ঘাটই একদিন আপনেরে খাইবো!

 

দৃশ্য

মজিদের ঘর। রাত। মজিদ, ময়না।

 

মজিদ ঘুমিয়ে আছে। চাপা কান্নার শব্দে তার ঘুম ভাঙে। সে উঠে চোখ ঢলতে ঢলতে দেখে ময়না বুকে একটা বাচ্চাদের পুতুল জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মজিদের মেজাজ খারাপ হয়।

মজিদ :            আবার শুরু করছোস!

ময়না : আপনের পাপের জইন্যই মাইয়াডা আমার বাঁচলো না!

মজিদ :            দ্যাখ মাঙ্গি(বিপ), শান্তিমতো একটু ঘুমাইতে দে! নাইলে কইলাম হাচাই লাথথি দিয়া  তর মাজা আমি ভাইঙ্গা ফালামু!

ময়না উঠে একটু সময় তীব্র চোখে মজিদের দিকে তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে যায়। মজিদ আবার শুয়ে পড়ে। অল্প সময়েই ঘুমিয়ে নাক ডাকতে শুরু করে সে।

 

দৃশ্য

মজিদের ঘর। দিন। মজিদ, ময়না।

 

মজিদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জামায় আতর, চোখে সুরমা মাখে। তারপর ঘুরে বের হতে গিয়ে দেখে মেঝেতে ময়নার মাথার চুল পড়ে আছে। রাগে জ্বলে ওঠে মজিদের চোখ।

মজিদ :            ময়না! ওই ময়না!

ময়না হন্তদন্ত ভঙ্গিতে একটা পান হাতে ঢোকে।

ময়না : এই যে আপনের পান।

মজিদ পানটা নিয়ে ইশারায় চুল দেখায় ময়নাকে।

মজিদ :            কতদিন কইছি চুল নষ্ট করবি না!

ময়না তাড়াতাড়ি একটা চুলে ভর্তি পলিব্যাগ এনে চুলটা তুলে সেটার মধ্যে রাখে। মজিদ পান মুখে দিয়ে পলিটা নিয়ে হাতে ওজন মাপার ভঙ্গি করে।

মজিদ :            নাহ! এক কেজি অহনো হয় নাই! নে, যতœ কইরা রাখ। এক কেজি পুরলে দোকানে  দিয়ামুনে।

মজিদ ময়নার হাতে ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়। ময়না সেদিকে তাকিয়ে বলে,

ময়না : খাইস্টা!

 

দৃশ্য ৮।

ঘাট। দিন। মজিদ, নুরীর মা, সরুফা, সুমন, অন্যান্য।

 

মজিদ ঘাটে দাঁড়িয়ে পান খাচ্ছে। একটা নৌকা এগিয়ে আসে। ঘাটে এসে ভেড়া নৌকায় সুমনের পাশে নুরীর মাকে দেখে মজিদের মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফোটে। কিন্তু নৌকা থেকে নামার সময় সুমন নুরীর মায়ের সাথে সাত-আট বছরের সরুফাকে নিয়ে নামলে মজিদের চওড়া হাসিটা দপ করে নিভে যায়। সুমন নুরীর মা আর সরুফাকে নিয়ে উঠে আসে। মজিদকে দেখে হাসিমুখে বলে,

সুমন :              আইজকা দুইডা ওস্তাদ। এইডা হইতাছে নুরীর মা আর এইডা হইতাছে..

সুমনের কথার মাঝেই মজিদ খেঁকিয়ে ওঠে।

মজিদ :            ওইডা তো আ-া! তরে না কইছি কহনো আ-া আনবি না!

সুমন কাঁচুমাচু হয়ে যায়।

সুমন :              অর মায় যেই ভাবে আমার কাছে আয়া কান্নাকাটি করলো ওস্তাদ, হেইডা দেখলে আপনেরও মন পানির লাহান গইলা যাইতো! মাইয়াডারে খাওন দিতে পারে না! তাই                       শহরে কামে পাডাইলো।

মজিদ :            তর এই কথা না এই শহরের মাইনষেরা শুনবো না! এইহানকার লোকেরা অহন আর  আ-া কামে রাখতে চায় না! গেরামের গরীব আ-ারা কী খাইবো, ক্যামনে বাঁচবো হেইদিকে কারো কোন খেয়াল নাই.. সব আছে শিশুশরম মারানির তালে! যাই হোক, আনছোস যহন থাক। দেহি কী করতে পারি। তয় এইডার টাকা তুই অহন পাবি না। কামে লাগাইতে পারলে দিমু.. তয় অর্ধেক।

সুমন মুখ গোজ করে মাথা দোলায়।

 

দৃশ্য

রাস্তা। দিন। মজিদ, নুরীর মা, সরুফা।

 

রাস্তা ধরে হেঁটে এগোচ্ছে তিনজন। সরুফা মুগ্ধ চোখে চারপাশ দেখছে।

নুরীর মা :         আর কতদূর ভাইজান?

মজিদ বিরক্ত চোখে তাকায়। কিছু বলে না।

নুরীর মা :         এট্টা গাড়িতে কইরা গেলে হইতো না?

মজিদ খেঁকিয়ে ওঠে।

মজিদ :            হ তোমার লাইগা আমি পেলেন নিয়ামুনে! এই শহরের রাস্তা দিয়া হাঁইটা যাইতে পারতেছো এইটাই তোমার কপাল!

নুরীর মা থেমে নাকিকান্নার সুরে বলে,

নুরীর মা :         হ রে ভাইজান, কপালের কথাই তো কই! আইজ যদি নুরীর বাপ আর নুরী বাঁইচা  থাকতো.. তাইলে কী আর আমার এই শহরে কাম করতে আইতে হয়? ওরে আমার কপাল রে..! ও নূরীর বাপ রে..! ও আমার নুরী রে..!

মজিদ বিরক্তির চরমে পৌঁছে যায়।

মজিদ :            ওরে মাঙ্গি(বিপ) ফাও প্যাচাল বন কর! নাইলে কইলাম..

এই সময় মজিদের খেয়াল হয় সরুফা আনমনে চারপাশ দেখতে দেখতে ফুটপাত থেকে নেমে রাস্তার কাছে চলে গেছে আর তার দিকে একটা গাড়ি ছুটে আসছে। মজিদ তাড়াতাড়ি গিয়ে টেনে সরায় সরুফাকে। গাড়িটা হুশ করে চলে যায় সামনে দিয়ে। মজিদ ভয়ে কাঁপতে থাকা সরুফাকে রাগত স্বরে বলে,

মজিদ :            ওই মাঙ্গি(বিপ), তর চোখ নাই! অত বড় গাড়িটা আইতাছে তুই দ্যাহোছ নাই? আরেকটু হইলেই তো দিছিলি আ¤্রে পুলিশের ফ্যারে ফালায়া! আর একবার যদি গ্যাছোস একখান চটকানা দিয়া গাল ভচকায়া দিমু কইলাম! লগে লগে হাঁটবি!

বলেই মজিদ হাঁটা শুরু করে। নুরীর মা তার পিছু নেয়। সরুফা একটু সময় মজিদের দিকে তাকিয়ে থেকে ছুটে গিয়ে তার পাশে পাশে হাঁটতে শুরু করে। এক সময় হাত দিয়ে মজিদের আঙুল ধরে। মজিদ দেখে, বিরক্ত হয় কিন্তু কিছু বলে না।

 

দৃশ্য ১০

ধনী বাড়ির ড্রয়িংরুম। দিন। মজিদ, সরুফা, নুরীর মা, মহিলা(কণ্ঠ)

 

মজিদ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নুরীর মাকে বলে,

মজিদ :            চা ভালা বানাইছো। মন দিয়া কাম করবা। কোন নালিশ য্যান আমার কাছে না আহে। আর মাসের শুরুতে বেতন হইলে আমি আসমু। সুমইন্যা কইছে না সব?

নুরীর মা মাথা দোলায়।

মজিদ :            চুরি-চামারি করবা না! করলে কইলাম একদম এক টান দিয়া ছিঁড়া ফালামু!

ভেতর থেকে একজন মহিলার কণ্ঠ ভেসে আসে।

মহিলা :            (অফভয়েস) নূরীর মা, একটু শুনে যাও তো।

মজিদ :            বেগম সাহেব ডাকে। যাও, হুইনা আহো কী কয়।

নূরীর মা চলে যায়। মজিদ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দ্রুত চারপাশে চোখ বোলায়। তারপর একটা দামী কিছু  নিয়ে পকেটে ভরে। সরুফার পুটলির ভেতর লুকিয়ে ফেলে। সরুফা দেখে মুখ টিপে হাসে। মজিদ চোখ গরম করে তাকায় তার দিকে। সরুফা সাথে সাথে ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে সে চুপ থাকবে বোঝায়।

 

দৃশ্য ১১

মজিদের বাড়ি। রাত। মজিদ, ময়না, সরুফা।

 

ময়না রান্না করছে। তার পাশে পুতুলটা রাখা। ময়না রান্না করতে করতে পুতুলটার সাথে কথা বলছে।

ময়না : তর বাপে একটা খাইষ্টা! তয় তুই তর বাপের চাইতেও বেশি খাইষ্টা! আ¤্রে একলা ফালায়া গেলি গা! ক্যান গেলি ক তো?

ময়না তাকায় পুতুলটার দিকে। এই সময় মজিদের গলার আওয়াজ পায় সে।

মজিদ :            (অফভয়েস) যত জ্বালা হইছে আমার!

ময়না তাড়াতাড়ি পুতুলটা লুকায়। মজিদ সরুফাকে সাথে নিয়ে ঢোকে। ময়না সরুফাকে দেখে অবাক হয়।

ময়না : ও আল্লা! এই মাইয়া ক্যাডা?

মজিদ :            আপদ! সুমইন্যা অর মায়ের কান্দন সইজ্য করতে না পাইরা গেরাম থেইকা নিয়াইছে! অহন কামে না লাগানি পর্যন্ত বহায়া বহায়া খাওয়াইতে হইবো!

ময়না সরুফার মাথায় হাসিমুখে হাত বুলিয়ে দেয়।

মজিদ :            অতো আহ্লাদ দিও না! যত পারো কাম করায়া নেও। খাওয়ানের পয়সা যেন উসুলহয়।

ময়না দ্রুত মাথা দোলায়। মজিদ ভেতরের দিকে পা বাড়ায়। একটু এগিয়ে যেতেই তার কানে সরুফার আনন্দিত স্বর ভেসে আসে।

সরুফা :           (অফভয়েস) এই পুতুলডা কার?

মজিদ ঘুরে তাকায়। দেখে ময়না সরুফার হাত থেকে পুতুলটা নিয়ে তার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে নিজের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করছে। মজিদের চেহারায় রাগ ফুটলেও সে কিছু বলে না। দ্রুত ভেতরে চলে যায়। ময়না হাঁপ ছাড়ে।

 

দৃশ্য ১২ (স্বপ্নদৃশ্য)

মজিদের ঘর। রাত। মজিদ, ময়না।

 

ময়না ঘুমাচ্ছে। মজিদ একটা ব্যাগ হাতে ঘরে ঢোকে। ময়নাকে ভালো করে লক্ষ্য করে মজিদ। তারপর সন্তর্পনে খাটের তলা থেকে একটা ট্রাঙ্ক টেনে বের করে। আরেকবার ময়নাকে দেখে নিয়ে ট্রাঙ্কটা খোলে। ট্রাঙ্কের ভেতর বাচ্চাদের কিছু পোশাকের উপর পুতুলটা রাখা। মজিদ পুতুলটা বের করে ট্রাঙ্কটা বন্ধ করে আবার খাটের তলায় পাঠিয়ে দেয়। এবার সে হাতে করে আনা ব্যাগটা খোলে। ব্যাগভর্তি টাকা। পুতুলটাকে টাকাগুলোর উপরে রেখে ব্যাগের চেন টেনে আটকে দেয় মজিদ। ঘুমন্ত ময়নাকে কিছুক্ষণ রাগী চোখে দেখে ব্যাগ হাতে বেরিয়ে যায় মজিদ।

 

দৃশ্য ১২ (স্বপ্নদৃশ্য)

রাস্তা। রাত। মজিদ।

 

ব্যাগ হাতে হনহন করে হাঁটছে মজিদ। তার পেছন থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসে। পেছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না মজিদ। কিন্তু কুকুরের ডাক এগিয়ে আসতে থাকে। মজিদের চেহারায় ভয় ফোটে। সে ছুটতে শুরু করে। এক সময় কুকুরের ডাক পেছনে পড়ে যায়। মজিদ থামে। ব্যাগটা নামিয়ে রেখে হাঁপাতে থাকে। আচমকা ব্যাগের মধ্য থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। মজিদ অবাক ভঙ্গিতে ব্যাগটা খোলে। ব্যাগের মধ্যে পুতুলটা নেই। টাকাগুলো রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে।

 

দৃশ্য ১২

মজিদের ঘর। রাত। মজিদ, ময়না।

 

মজিদ আর ময়না ঘুমাচ্ছে। মজিদ ধড়মড় করে উঠে বসে।

মজিদ :            আহ!

ময়না উঠে দেখে মজিদ বুকে হাত দিয়ে হাঁপাচ্ছে। ময়না ভয়ার্ত স্বরে জানতে চায়,

ময়না : ক.. কী হইছে?

মজিদ :            প.. পানি খামু!

ময়না নেমে তাড়াতাড়ি মজিদকে পানি এনে দেয়। মজিদ ঢকঢক করে পানি খায়।

ময়না : খারাপ স্বপন দ্যাখছেন?

মজিদ ময়নার দিকে তাকিয়ে শক্তমুখে বলে,

মজিদ :            না। তুই ঘুমা।

বলে মজিদ পানির গ্লাস ফেরত দিয়ে শুয়ে পড়ে। তবে তার ঘুম আসে না।

 

দৃশ্য ১৩

মজিদের ঘর। দিন। মজিদ, ময়না, সরুফা।

 

মজিদের চোখ বন্ধ। সরুফা পা টিপে টিপে এসে মজিদের পায়ের কাছে বসে পা টিপে দিতে শুরু করে। মজিদ চোখ খুলে তাকায়। সরুফাকে দেখে খেঁকিয়ে ওঠে।

মজিদ :            অই কী হইছে?

সরুফা :           আপনে নাকি রাইতে খারাপ স্বপন দ্যাখছেন! ঘুমান নাই। তাই পা টিপ্পা দিতাছি।  আরামে ঘুম আইবো।

মজিদ :            পাও টিপ্পা দিলে ঘুম আহে এইডা কে কইছে তরে?

সরুফা :           আমার বাপে। সারাদিন কাম কইরা যহন রাইতে ঘরে আইতো, আমারে কইতো পাও  টিপ্পা দিতে। আমি টিপ্পা দিলে বাপজান আরামে ঘুমাই যাইতো।

মজিদ :            হুমমম! তর বাপ কই?

সরুফা :           মইরা গ্যাছে। অসুখ করছিলো। আমার বাপজান গরীব আছিলো তো তাই ডাক্তারের কাছে যাইতে পারে নাই।

মজিদ :            মইরা গিয়াই ভালা করছে। এই দুনিয়ায় টাকা না থাকলে বাঁইচা থাকনের কোন ফায়দা নাই। টিপতাছোস যহন.. ভালা কইরা টেপ।

সরুফা ভালো করে মজিদের পা টিপে দিতে থাকে। মজিদ আরামে চোখ বোজে। ময়না এসে ঢোকে। সে মজিদকে কিছু বলতে গেলে সরুফা ইশারায় নিষেধ করে। ময়নার মুখে হাসি ফোটে। মজিদ চোখ বন্ধ অবস্থাতেই জানতে চায়,

মজিদ :            নাম কী রে তর?

সরুফা :           সরুফা।

মজিদ ঝট করে উঠে বসে। জ্বলন্ত চোখে তাকায় সরুফার দিকে। তারপর আচমকাই ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দেয় সরুফার গালে। সরুফা হাত দিয়ে গাল চেপে ধরলেও কাঁদে না। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে মজিদের দিকে। ময়নাও অবাক।

ময়না : অরে মারলেন ক্যান?

মজিদ :            চুপ থাক মাঙ্গি(বিপ)!

মজিদ টান দিয়ে একটা জামা নিয়ে পরে। সে বেরিয়ে যেতে শুরু করলে ময়না জানতে চায়,

ময়না : খাইবেন না?

মজিদ হিং¯্র ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে খেঁিকয়ে ওঠে,

মজিদ :            তরে না চুপ থাকতে কইলাম!

মজিদ বেরিয়ে যায়। ময়না সরুফাকে জড়িয়ে ধরে।

ময়না : ব্যথা বেশি পাইছো?

সরুফা না-সুচক মাথা দোলায়।

 

দৃশ্য ১৪

ঘাট। দিন। মজিদ।

 

হনহন করে হেঁটে এসে ঘাটের কাছে থামে মজিদ। তার হাতে কাল রাতে স্বপ্নে দেখা ব্যাগটা। ব্যাগটা নামিয়ে খোলে সে। ব্যাগভর্তি টাকা। সে কিছু টাকা মুঠো করে বের করে। তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে,

মজিদ :            এই টাকার লাইগা তুই আমারে আর আমার বাপেরে ছাইড়া গেছিলি না মা! এই দ্যাখ,   তর পোলা অহন কত টাকার মালিক! আয় দ্যাখ.. আয়!

বলতে বলতে টাকাগুলো বাতাসে ছুড়ে দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে মজিদ। টাকাগুলো উড়ে উড়ে পড়ে তার উপর।

 

দৃশ্য ১৫

মিউজিক্যাল মন্তাজ। বিভিন্ন স্থান। দিন/রাত। মজিদ, ময়না, সরুফা, জনৈক লোক, মারুফ।

 

মায়ের একধার দুধের দাম/ কাটিয়া গায়ের চাম/ পা পোশ বানাইলেও শোধ হবে না.. গানের সাথে নিচের দৃশ্যগুলো দেখা যায়।

 

ক.        ময়না রান্না করে। সরুফা তাকে সাহায্য করে।

খ.         সরুফাকে খাইয়ে দিচ্ছে ময়না। মজিদ এসে ঢুকতেই ময়না থমকায়। তবে মজিদ দেখেও দেখে    না।

গ.        মজিদের জন্য পান নিয়ে আসে সরুফা। মজিদ আবার চড় দেয় সরুফাকে।

ঘ.         ময়না আর সরুফা পুতুলটা নিয়ে খেলে। পুতুলটাকে বিভিন্ন রকম পোশাক পরায়।

ঙ.        মজিদ বাজারে একটা লোকের সাথে কথা বলছে। লোকটা যেন মজিদের কথায় রাজি হয় না।

চ.         ময়না সরুফাকে নতুন পোশাক পরিয়ে মাথা আঁচড়ে দেয়। তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।

ছ.         সরুফাকে আমপারা পড়ায় ময়না।

জ.       মজিদ ঘুমিয়ে আছে। সরুফা সুরা পড়ে তার মাথায় ফুঁ দিয়ে দেয়। ময়না হাসিমুখে দেখে।

ঝ.        ময়নাকে আর্দশলিপি পড়ায় সরুফা।

ঞ.       একটা ফ্ল্যাট বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে মজিদ কথা বলছে মারুফের সাথে। মারুফ তার কথায় খুশি   হয়ে মাথা দোলায়।

 

দৃশ্য ১৬

মজিদের বাড়ি। রাত। ময়না, মজিদ, সরুফা।

 

ময়না আর সরুফা কিছু একটা নিয়ে হাসাহাসি করছে। মজিদ এসে ঢোকে গম্ভীর মুখে। ময়না আর সরুফার হাসাহাসি থেমে যায়।

মজিদ :            কাইল সকালে অরে রেডি কইরা দিবা ময়না। অর জইন্য কাম পাইছি।

ময়না : কইতেছিলাম কী, আমার তো শরীরটা কয়দিন ধইরা খারাপ। বাড়িতে ও থাকলে আমার  কামকাইজে সুবিধা হয়।

মজিদ :            তোমারে দরকার হইলে আমি অন্য কামের লোক আইনা দিমু। অহন যা কইছি তাই করবা। সকালে অরে য্যান আমি রেডি পাই।

বলে মজিদ গটগট করে ঢুকে যায় ঘরের ভিতর। সরুফা ময়নাকে জড়িয়ে ধরে।

 

দৃশ্য ১৭

মারুফের ফ্ল্যাট বাসা। দিন। মারুফ, জলি, মজিদ, সরুফা।

 

মজিদ সরুফাকে দিতে এসেছে। জলি সরুফার গাল টিপে বলে,

জলি :               বাহ! মেয়েটা তো বেশ কিউট!

মারুফ হাসে।

মজিদ :            আমার টাকাগুলা দেন স্যার। আমি যাই গা।

মারুফ কিছু টাকা দেয় মজিদের হাতে। মজিদ টাকা গুনতে থাকে।

মারুফ :           জলি, তুমি ওনাকে কিছু খেতে দাও।

জলি :               হুমম, দিচ্ছি।

মারুফ আর জলি ভেতরে চলে যায়। মজিদ টাকা গোনা শেষ করে বেরিয়ে যেতে ধরে। সরুফা তাকে ডাকে,

সরুফা :           বড় আব্বা।

মজিদ অবাক চোখে তাকায়। সরুফা তাড়াতাড়ি গিয়ে দামী কিছু একটা এনে হাসিমেুখে মজিদের দিকে বাড়িয়ে ধরে। মজিদ আনমনে সেটা নিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে যায়।

 

দৃশ্য ১৮

মিউজিক্যাল মন্তাজ। বিভিন্ন স্থান। দিন/রাত। মজিদ, ময়না, সরুফা, হাকিম, দোকানদার, মারুফ, জলি, সাইফুল, সুমন, জনৈক মেয়ে।

 

ক.        মজিদ হাকিমের কলার ধরে থাপড়ায়।

খ.         মারুফ আর জলি হাসিমুখে ভয়াল দর্শন সাইফুলের সাথে কথা বলছে। সরুফা চায়ের ট্রে এনে রাখে তাদের সামনে। সাইফুল ভালো করে দেখে সরুফাকে। একটা চকলেট বের করে দেয়।      সরুফা নিতে না চাইলে জলি তাকে দিয়ে নেয়ায়।

গ.        মজিদ দোকান থেকে পান খেয়ে দাম দেয় না।

ঘ.         মজিদ ময়নাকে দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে চুল তোলায়।

ঙ.        মজিদ আর ময়না ঘুমাচ্ছে।

চ.         মজিদ ঘাটে সুমনের কাছ থেকে আরেকটা মেয়েকে বুঝে নেয়।

ছ.         মারুফ সরুফার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে হাসিমুখে ফোনে কথা বলছে কারো সাথে।

ঞ.       ময়না পুতুল নিয়ে কাঁদে। হঠাৎ যেন তার মাথা দুলে ওঠে। তার হাত থেকে পুতুলটা পড়ে   যায়।

 

দৃশ্য ১৯

মজিদের ঘর। রাত। মজিদ, ময়না।

 

মজিদ বিছানায় বসে আয়েস করে পান চিবুচ্ছে আর মাঝে মাঝে পানের পিক ফেলছে পিকদানিতে। ময়না আসে।

ময়না : একটা কথা বলবো?

মজিদ মাথা নেড়ে বলতে বলে।

ময়না : গিয়া এবার সরুফারে দেইখা আইবেন।

মজিদ :            হ যামু। কাইল বাদে পরশু অর বেতন পাওনের কথা। গিয়া আমার কমিশন নিতে                          হইবো।

ময়না : ওই মাইয়াডার কাছ থিকা কমিশন না নিলে হয় না?

মজিদ শক্তমুখে বলে,

মজিদ :            না!

ময়না : সরুফার উপর আপনের এতো রাগ কীসের?

মজিদ রাগে জ্বলে উঠে বলে,

মজিদ :            সরুফা আছিলো আমার মায়ের নাম! তুমি কী আর কিছু বলবা?

ময়না ধীরে ধীরে না-সুচক মাথা দোলায়। মজিদ থু থু করে পিকদানিতে মুখের পান ফেলে দিয়ে পানির গ্লাস নিয়ে কুলি করে। তারপর শুয়ে পড়ে।

 

দৃশ্য ২০

মারুফের বাসা। দিন। মজিদ, মারুফ, সাইফুল, জলি, সরুফা।

 

মারুফ বড় এক বা-িল টাকা গুনছে। সাইফুল হাসিমুখে বলে,

সাইফুল :         গোনা লাগবে না মারুফ। দশ লাখই আছে।

মারুফ হেসে গোনা বন্ধ করে। সরুফা জলিকে বলে,

সরুফা :           আপনেরা আ¤্রে বেঁইচা দিতেছেন?

জলি :               আরে নাহ! বোকা মেয়ে বলে কী! বেঁচে দেবো কেন? আমরা তোমাকে আরেক জায়গায় কাজে পাঠাচ্ছি। তুমি ওই আঙ্কেলের সাথে যাবে। রাস্তায় একদম কান্নাকাটি করবে না কেমন। ওখানে গিয়ে তুমি অনেক ভালো থাকবে। আঙ্কেল যা যা বলবে তাই তাই করবে। তাহলে ওখানে সবাই তোমাকে অনেক চকলেট দেবে। বুঝেছো?

সরুফা মাথা দুলিয়ে বলে,

সরুফা :           জ্বে। যাওনের আগে একবার বড় আব্বার লগে দেখা হইবো না?

মারুফ :           বড় আব্বাটা আবার কে?

সরুফা :           মজিদ বড় আব্বা।

মারুফ :           ও! ওই চোরটা!

সরুফা :           আমার বড় আব্বা মোটেও চোর না!

জলি :               হ্যাঁ, হ্যাঁ, চোর না। শোন, এবার তো আর দেখা করবার সময় নেই। তুমি ছুটিতে এসে দেখা কোরো। তখন বিদেশ থেকে তোমার বড় আব্বার জন্য তুমি গিফটও নিয়ে আসতে পারবে।

সরুফা যেন বুঝতে পারছে এমন ভঙ্গিতে মাথা দোলায়।

সাইফুল :         তাহলে আর দেরি করে লাভ নেই। আমি ওকে নিয়ে বের হই।

মারুফ মাথা দোলায়। তখনি কলিংবেলের আওয়াজ ভেসে আসে।

জলি :               আমি দেখছি।

জলি উঠে গিয়ে দরজা খোলে। মজিদ হাসিমুখে ঢোকে।

মজিদ :            স্লামালেকুম বেগম আম্মা। সরুফার বেতনের কমিশন নিতে আসলাম।

মজিদকে দেখা মাত্রই সরুফা ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।

সরুফা :           হ্যারা আ¤্রে বেঁইচা দিতাছে!

মজিদ অবাক চোখে তাকায় মারুফদের দিকে।

মারুফ :           আরে না, না। এরকম কিছু না। আমরা ওকে আমার এই বন্ধুর বিদেশের বাসায় কাজে পাঠাচ্ছি।

মজিদ সাইফুলের দিকে একবার দেখে নিয়ে হেসে বলে,

মজিদ :            স্যার, আমারে এই সবের বুঝ দেওনের কোন দরকার নাই। কোনডা ঘুঘু আর কোনডা ফাঁদ হেইডা আমি ভালা কইরাই বুঝি। হুদাহুদি মানুষ আ¤্রে খাইষ্টা মজিদ কয়া ডাকে না। ব্যবসা করবেন এইডা তো ভালা কথা। তা এই ব্যবসায় লাভ কেমুন?

সাইফুল :         কেন? লাভ জেনে তুমি কী করবে?

মজিদ :            লাভ বেশি হইলে যত মাইয়া লাগে আইনা দিমু। কন না লাভ কেমুন?

সাইফুল :         প্রতি মেয়েতে তুমি পঞ্চাশ হাজার করে পাবে।

মজিদ :            হইলো না!

সাইফুল :         তাহলে তুমিই বলো কতো চাও?

মজিদ :            এক লাখ কইরা।

সাইফুল :         ওকে দেবো। মারুফ, তোর ওখান থেকে এই মেয়ের জন্য ওকে এক লাখ টাকা দে তো। আমি তোকে কাল বা পরশু পাঠিয়ে দেবো।

মারুফ :           ঠিক আছে।

মজিদ :            না, ঠিক নাই।

সাইফুল :         মানে?

মজিদ :            ব্যবসা হইবো এ্যার পর থিকা। কিন্তু এই মাইয়ারে নিয়া কোন ব্যবসা হইবো না।

মারুফ :           কী বলতে চাও তুমি।

মজিদ :            কথা তো সোজাই কইলাম স্যার। আপনাগো যত মাইয়া লাগবো আমি আইনা দিমু। তয় সরুফারে কোনহানে পাঠানো যাইবো না। অয় আমার লগে আমার বাড়িত যাইবো।

সাইফুল রেগে যায়।

সাইফুল :         মগের মুল্লুক নাকি! ওর জন্য পনেরো লাখ টাকার ডিল হয়ে গেছে।

মজিদ :            স্যার, মুল্লুক মগেরই হোক আর জগেরই হোক, কথা একটাই.. এই মাইয়া আমার লগে যাইবো।

সাইফুল রেগে পিস্তল বের করে।

সাইফুল :         তোকে শালা আমি এক পয়সাও দেবো না! এখানে তোর লাশের উপর দিয়ে আমি  ওকে নিয়ে যাবো।

মজিদ সরুফাকে তার পেছনে সরিয়ে দেয়।

মজিদ :            তাই করেন স্যার। কিন্তু আমি জীবিত থাকতে সরুফা যাইবো না!

মারুফ :           মজিদ মিয়া, বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু! ও কিন্তু সত্যিই গুলি করবে!

মজিদ বাঁকা হাসে।

মজিদ :            যারা কিছু করতে পারে স্যার.. হ্যারা হুদাহুদি প্যাঁচাল পাইড়া ভয় দেখায় না। জীবনে তো আর কম দ্যাখলাম না।

সাইফুল :         ইউ বাস্টার্ড!

গুলির শব্দ হয়। সাইফুলের দিকে তাকানো মজিদের মুখে তাচ্ছ্বিল্যের হাসি।

 

দৃশ্য ২১

মজিদের বাড়ি। দিন। ময়না।

 

ময়না একটা তরকারীর হাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ তার মাথা ঘুরে ওঠে। হাড়িটা পড়ে যায় হাত থেকে। সে ছুটে গিয়ে বমি করতে থাকে। বমি করা শেষ করে ঘোরে। তার মুখে লাজুক হাসি। সে স¯েœহে নিজের পেটের উপর হাত বোলায়।

 

দৃশ্য ২২

ঘাট। দিন। মজিদ।

 

নদীর পানিতে ভাসছে মজিদ, তার মুখে হাসির রেশ। রক্তে চারপাশের পানিটা লাল হয়ে আছে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *