কাডঃ গল্প এবং চিত্রনাট্য

সবুজ ওয়াহিদ

 

গল্প

মাইয়াডা বড়ই সোন্দর!

নিজের কৈশোর চোখের সামনে পুনঃনির্মিত হওয়া দেখতে দেখতে ভাবে হুরমতি। এমনই তো হয়েছিলো তখন! সে এভাবেই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতো হাসু ভাইকে। সারাক্ষণ সতর্ক থাকতো হাসু ভাই যেন তাকে দেখে না ফেলে। তবু একদিন ধরা পড়ে গেল। কী লজ্জা! কী লজ্জা!

কিন্তু তখন তো অমন কিছু হয়নি! উজ্জ্বল আলোর মধ্যে সুন্দর মেয়েটাকে লাফিয়ে-ঝাফিয়ে নাচ-গান করতে দেখে চোখ কপালে ওঠে হুরমতির। শহর থেকে আসা দলটার একজনকে ফিসফিস করে তার বিস্ময়ের কথাটা জানায় সে। এটা মিউজিক ভিডিও; মুল সিনেমার অংশ নয়, লোকটা তাকে বোঝায়। নায়কের আসতে দেরি হচ্ছে বলে ডিরেক্টর সাহেব এই ফাঁকে মিউজিক ভিডিওটা বানিয়ে নিচ্ছেন। নায়ক! আরো অবাক হুরমতি। যে হাসু মিয়া হবে সেই নায়ক, কোনোরকমে কথাটা বলে লোকটা চলে যায়। মিউজিক ভিডিও, নায়ক বা সিনেমার কিছুই বোঝে না হুরমতি। সে শুধু বোঝে এরা তার ঘটনাটা দেশ-বিদেশের সবাইকে দেখাবে। গাঁয়ের লোকেরা যে এই ঘটনা জানে না তা নয়। সেজন্য তাকে সবাই দূর-ছাইও করে। কিন্তু দেশ-বিদেশের লোকেরা এই ঘটনা জেনে নাকি তাকে অনেক সম্মান দেবে। সম্মান অবশ্য খুব বেশি চায় না সে। সে শুধু চায় সুন্দরমতো মেয়েটা যেন তার ঘটনাটাকে ঠিকমতো দেখায়। তা খারাপ করছে না মেয়েটা। তবে বড্ড দেমাগ মেয়েটার! সেদিন পুকুরপাড়ে মেয়েটা একা একা হেঁচকি তুলছে দেখে পানি নিয়ে দিয়েছিলো সে। মেয়েটা তখন এমনভাবে তার দিকে তাকালো! মানুষের দূর-ছাই নয় বরং এই দৃষ্টিটাকেই বেশি ভয় পায় হুরমতি। কেউ তার দিকে এভাবে তাকালে নিজেকে একটা ছ্যাঙ্গা বলে মনে হয় তার।

নায়ক এসে পৌঁছায়। তার আর হাসু ভাইয়ের জীবন আবার চলমান হয়। এই জীবনে একে একে ঢুকে পড়ে দেশ স্বাধীনের স্বপ্ন, খান সেনা, রাজাকার, রক্ত, মৃত্যু। সব ভালো করলেও খান সেনা আর রাজাকারেরা যখন তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যেতে চায় তখন আর ভালো করতে পারে না মেয়েটা। কোনো রাজাকার বা খান সেনা তার হাত ধরে টানতে শুরু করলেই খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ে মেয়েটা। তার নাকি সুড়সুড়ি লাগে! আর এমন হলেই সাদা টুপি পরা লোকটা– যাকে সবাই ডিরেক্টর সাহেব বলে অনেক সম্মান সমীহ করে– কাট, কাট বলে চেঁচিয়ে ওঠে। সাথে সাথে থেমে যায় সবাই, কেউ আর জবরদস্তি করে না মেয়েটার সাথে!

প্রথমে কিছুক্ষণ এসবের কিছুই বুঝতে পারে না হুরমতি। তারপর বিহ্বলের মতো গিয়ে দাঁড়ায় ডিরেক্টর সাহেবের পাশে। আনমনেই বলে ওঠে, তহন কেউ কাড কইলো না ক্যান বাজান! ডিরেক্টর অবাক। কী বলছে এই মহিলা! কী বলতে চাচ্ছে সেটা ব্যাখ্যা করার মতো অবস্থায় নেই আর তখন হুরমতি। ডিরেক্টরের জামার প্রান্ত ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে সে উন্মাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলে চলেছে, তহন কেউ কাড কয় নাই ক্যান বাজান.. কেউ কাড কয় নাই ক্যান..!

চিত্রনাট্য

দৃশ্য

গ্রামে শুট্যিং জোন। দিনবিকাল।

সারাহ, ডিরেক্টর, ব্যাক ড্যান্সার, শুট্যিংয়ের লোকজন, হুরমতি, গ্রামের কিছু মহিলা, শিশু, কিশোর।

 উত্তেজক কোন গানের সাথে আইটেম ড্যান্সের শুট্যিং চলছে। নায়িকা সারাহ ব্যাক ড্যান্সারদের সাথে নাচছে। গ্রামের মহিলা আর শিশুরা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে শুট্যিং দেখছে। তাদের সামনে দড়ি দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুটিং ইউনিটের কয়েকজন। কিছু কিশোর-তরুণ আশে পাশের গাছে উঠে শুট্যিং দেখছে। ডিরেক্টরের চোখমুখ গম্ভীর, যেন নিতান্ত অনিচ্ছাতে শুট্য করছে সে। হুরমতি অবাক ভঙ্গিতে এডি বা স্পটবয়ের কাছে কিছু জানতে চায়। এডি বা স্পটবয় হাতের ইশারায় তাকে ডিরেক্টরের দিকে দেখায় (গানের শব্দের কারণে এই কথোপকথনের কিছুই শোনা যায় না)। হুরমতি অবাক মুখে নার্ভাস ভঙ্গিতে এগোতে থাকে ডিরেক্টরের দিকে। নাচ চলছে। হুরমতি গিয়ে দাঁড়ায় ডিরেক্টরের পাশে। কাজে মগ্ন ডিরেক্টরের জামার প্রান্ত ধরে মৃদু টান দেয় সে। ডিরেক্টর বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকায় হুরমতির দিকে। হুরমতির চোখের দিকে তাকিয়ে ডিরেক্টর প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশি জোরেই বলে ওঠে–

ডিরেক্টর : কাট!

হুরমতি একটু কেঁপে ওঠে। শুট্যিং জোনের আশেপাশের গাছ থেকে কিছু পাখি উড়ে যায়।

 

উড়ন্ত পাখির ঝাঁককে অনুসরণ করে ক্যামেরা। ওপেনিং টাইটেল যেতে থাকে..

 

দৃশ্য

গ্রামে মেঠো পথের ধারে চায়ের টং দোকান। দিনবিকাল।

কয়েকজন বিভিন্ন বয়সী গ্রাম্য লোক, স্থানীয় স্কুলের কম বয়েসী একজন শিক্ষক, দোকানদার, দুইজন শিশু।

এক ঝাঁক পাখি উড়ে যায়। ক্যামেরা প্যান করে উড়ন্ত পাখি থেকে চলে আসে চায়ের দোকানে। দোকানের সামনের মেঠো পথ ধরে একজন শিশুকে সুপারি পাতার খোলায় চাপিয়ে টেনে নিয়ে যায় আরেকজন শিশু। চায়ের দোকানের বেঞ্চে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে কিছু লোক চা খাচ্ছে। একজন শিক্ষককে বলে–

লোক (১) : ও মাস্টের, হুরুরে কি বিদেশে নিয়ে যাবেনে নাহি?

শিক্ষক একটু অবাক চোখে তাকায় লোকটার দিকে। লোকটা ব্যাখ্যা দেবার ভঙ্গিতে বলে–

লোক (১) : অরে নিয়ে যেইরাম তোড়জোড় শুরু হএছে! মনে তো কচ্চে বিদেশ না গিলিও হুরু এবার মেম্বার-টেম্বার কিচু এট্টা হএ যাবেনে!

শিক্ষক কিছু না বলে মৃদু হেসে চায়ে চুমুক দেয়। একজন মুখ গোজ করে বলে–

লোক (২) :  অএ.. ভিক্কে কইরে যার দিন যায় সে হবেনে মেম্বার! তয় মাস্টের আমি  কইয়ে থুচ্চি, যা হচ্চে তা কিন্তু মোটেও ভালো কিচু হচ্চে না!

শিক্ষক : এভাবে বলছেন কেন?

লোক (২) : কবো না ক্যান? সেই কবে কোন যুদ্ধের সুমায় এট্টা ঘটনা ঘটিলো.. এহন সেই সব নিয়ে গিরামের বেইজ্জতির খবর লোকেরে জানায় বেড়াতি অচ্চে!

শিক্ষক একটু উত্তেজিত হয়ে বলে–

শিক্ষক : এটা যেন তেন কোন ঘটনা নয় চাচা। যা হয়েছিলো সেটা অন্যায়..  অপরাধ। আর একটা তো নয়! এরকম ঘটনা একাত্তর সালে অনেক হয়েছে। এই সব অপরাধের কথা সবার জানা দরকার। এই সব অন্যায়ের  বিচার হওয়া দরকার।

লোক (২) : গিরামের মদ্যি হুজ্জোত কইরে খুব বিচার করতিছাও তুমরা! রাইত- বিরেইতে ঘুমির ডিসটাব!

লোক (২): গজগজ করতে করতে চায়ে চুমুক দেয়।

লোক (১) : কএটটা দিন আমরা য্যান এট্টু সইজ্য করি সেইডে তো এমপি সাব নিজি  আইসেই কইয়ে গেছেন ছলিম ভাই।

লোক (২) : তা তো কবেই! আমাগে ঘুমির ডিসটাব হলি কি হবে.. যাইয়ে দেহগে এই সব করতি দিয়ে এমপি কত টাহা পাচ্চে! শহরে যাওয়ার রাস্তাডা খুইড়ে রাহিছে ছয়ডা মাস ধইরে! সেইডে ঠিক করার নামে খবর নেই! আচে খালি বিচার-আচার আর নাচার তালে! যত্তসব!

বলতে বলতে লোক (২)রাগত মুখে চায়ের গ্লাস ঠাশ করে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ায়। পকেট থেকে বের করে দোকানদারকে চায়ের দাম দিয়ে গটগট করে হাঁটা ধরে। শিক্ষক চিন্তিত চোখে তাকিয়ে লোক (২)-এর চলে যাবার দিকে। সেটা লক্ষ্য করে লোক (১)বলে–

লোক (১) : আচ্চা মাস্টের, হুরু তো ছোড কালে পাড়া ভইরে ওইরাম নাইচে-গাইয়ে বেড়াতো না! তালি পারে উরা ওইসব দেহাচ্চে ক্যান?

শিক্ষক কিছু না বলে চিন্তিত মুখে চায়ে চুমুক দেয়।

 

দৃশ্য

শুট্যিং ইউনিটের থাকার ঘরের একটা। রাতসন্ধ্যা।

প্রডিউসার, ডিরেক্টর।

ম্যাচ কাটে ঘরের ভেতর মদের গ্লাসে চুমুক দেয় প্রডিউসার। সুফি ধরণের কোন গান বাজছে। মদ খেয়ে যেন খুব যেন মজা পাচ্ছে এমন ভঙ্গিতে চোখ বুজে গানের তালে মাথা দোলাতে থাকে প্রডিউসার। ঘরের দরজা খুলে বিরক্তমুখে ঢোকে ডিরেক্টর। এক মুহূর্ত প্রডিউসারের দিকে তাকিয়ে দেখে মাথায় থাকা ক্যাপ খুলে ছুড়ে মারে বিছানায়। বিছানায় থাকা কয়েকটা খালি বিয়ারের ক্যান ক্যাপের ধাক্কায় উল্টে পড়ে ঝনঝন করে শব্দ হয়। প্রডিউসার চোখ খুলে মাতাল চোখে তাকায় ডিরেক্টরের দিকে। ডিরেক্টর বিছানায় বসে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে আছে। প্রডিউসার সোজা হবার চেষ্টা করতে করতে বলে–

প্রডিউসার : শেষ?

ডিরেক্টর ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে রাগত স্বরে বলে–

ডিরেক্টর : কালকে তোর হিরো আসলে ভালো। নয়তো আমাকে বিকল্প ভাবতে হবে। আমি এখানে একজন বীরাঙ্গনার বায়োপিক বানাতে এসেছি.. মিউজিক ভিডিও বানানোর নামে ফাজলামি করবার জন্য নয়!

প্রডিউসার : কুল ম্যান.. কুল! বায়ো তো বানাবো। কাল হিরো চলে আসবে.. দেন শুট্যিং স্টার্ট। কিন্তু এসব বানিয়ে কী আর্ন করবি?

ডিরেক্টর চুপ। প্রডিউসার মাতাল ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জড়ানো স্বরে বলে–

প্রডিউসার : দু-চারটা হাততালি। নিউজ পেপারে দু–কলাম স্পেস। টিভিতে ইন্টারভিউ বাইট। খুব বেশি হলে আঁতেল কোন গ্রুপের পক্ষ থেকে একটা এওয়ার্ড। এসব করে পেটে ভাত জুটবে?

ডিরেক্টর গম্ভীর স্বরে বলে–

ডিরেক্টর : তুই ভালো করেই জানিস ভাতের চিন্তা করলে আমি এটা বানাতে আসতাম  না!

প্রডিউসার ডিরেক্টরের কাঁধে হাত রেখে বলে–

প্রডিউসার : ওকে। মানলাম তোর কথা। কিন্তু এরকম কাজ আরেকটা করার মতো ফাইন্যান্স কি যোগাড় করতে পারবি?

ডিরেক্টর থমকে যায়। প্রডিউসার যেন তর্কে জিতে গেছে এমন খোশ মেজাজে বলে–

প্রডিউসার : অতএব, স্বরস্বতী-লক্ষ্মী দু’জনের হাত ধরেই চলতে হবে বন্ধু। রথও দেখতে হবে.. সাথে মওকা বুঝে কলাও বেঁচতে হবে।

এসে আবার নিজের চেয়ারে বসে মদের গ্লাস তুলে নেয় প্রডিউসার। ডিরেক্টরের দিকে তাকিয়ে বলে–

প্রডিউসার : অভিমান স্লাইড সাইডে সরিয়ে রেখে টক করে দু’পেগ মেরে দে। মগজে  শিল্প জমবে ভালো।

ডিরেক্টর গম্ভীর মুখে এসে বোতল থেকে গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে বলে–

ডিরেক্টর : শিল্প আমি মদ ছাড়াও জমাতে জানি। তোর হিরো কালকে না আসলে কিন্তু চেঞ্জ ফাইনাল।

প্রডিউসার হাতের গ্লাস ডিরেক্টরের দিকে তুলে বলে–

প্রডিউসার : উল্লাস!

 

গ্রামে সকাল হবার ট্রাঞ্জিশন..

 

দৃশ্য

গ্রামের মেঠোপথ। দিনসকাল।

দুজন শিশু।

একজন শিশু সুপারি পাতার খোলায় চাপিয়ে আরেকজনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে একটা গাড়ি এগিয়ে আসতে দেখে তারা তাড়াতাড়ি পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। গাড়িটা তাদের পাশ দিয়ে চলে গেলে তারা গাড়ির পিছু পিছু ছুটতে থাকে।

 

দৃশ্য

গ্রামে শুট্যিং জোন। দিনসকাল।

সারাহ, ডিরেক্টর, শুট্যিংয়ের লোকজন, হুরমতি, ফারদিন।

শুট্যিং জোনে ব্যস্ততা। হুরমতি গুটি গুটি পায়ে এসে একটা গাছের নিচে বসে। একজন স্পটবয় এটা লক্ষ্য করে তার দিকে এগিয়ে আসে। হুরমতি ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়ায়। স্পটবয় তার সামনে এসে বিরক্ত স্বরে বলে-

স্পটবয় : খালা, কাল যা করার করছেন! আজ কিন্তু ভুলেও সাইদ ভাইয়ের ধারে কাছে যাবেন না। বুঝেছেন?

হুরমতি ভয়ে ভয়ে দ্রুত উপর-নিচে মাথা দোলায়। এই সময় গ্রামের মেয়ের সাজে থাকা সারাহকে কিছু বোঝাতে বোঝাতে ফ্রেম ইন করে ডিরেক্টর। উল্টোদিক থেকে গাড়িটাও এসে থামে শুট্যিং জোনে। ডিরেক্টর সারাহকে হাতের ইশারায় একদিক দেখিয়ে দিয়ে দ্রুত পায়ে এগোয় গাড়ির দিকে। গাড়ি থেকে নামে নায়ক ফারদিন। ডিরেক্টর গিয়ে তার সাথে হাত মেলায়। এদিকে স্পটবয় নিজের মনেই বলে–

স্পটবয় : উফ..হিরো এসে গেছে! বাঁচলাম!

স্পটবয় শুট্যিং জোনের দিকে এগোতে গেলে হুরমতি তার জামার প্রান্ত টেনে ধরে। স্পটবয় ঘুরে বিরক্ত স্বরে বলে–

স্পটবয় : আবার কী?

হুরমতি : হাসু ভাই আসপে না?

স্পটবয় হেসে ইশারায় ডিরেক্টরের সাথে কথা বলতে বলতে মেকাপ রুমের দিকে যেতে থাকা ফারদিনকে দেখিয়ে বলে–

স্পটবয় : উনিই আপনার হাসু ভাই।

হুরমতির চোখে অবিশ্বাস। এটা দেখে স্পটবয় আবার বলে–

স্পটবয় :  ম্যাজিক বোঝেন? যাদু? এটা হলো সেই যাদু। ওই যে ওই ঘরটা  দেখছেন না.. ওই ঘরে এখন গিয়ে ঢুকবে আমাদের হিরো, আর একটু                                 পরে বের হয়ে আসবে আপনার হাসু ভাই। আপনি এখানে বসে যাদু দেখেন, আমি আপনার জন্য নাস্তা পাঠাচ্ছি। তবে ভুলেও সাইদ ভাইয়ের কাছে যাবেন না.. কেমন?

হুরমতি মেকাপ রুমে ঢুকে যেতে থাকা ফারদিনের দিকে তাকিয়েই যেন স্পটবয়ের কথা বুঝতে পেরেছে এমন ভঙ্গিতে মাথা দোলায়। হুরমতির চোখের সামনে ফারদিন মেকাপ রুমে ঢুকে যায়। স্পটবয়ও চলে যায়।

 

ফাস্ট ফরোয়ার্ডে শুট্যিং জোনের কার্যক্রম। হুরমতির সামনে নাস্তা রেখে যায় একজন। হুরমতি খায় না। সে একবার উঠে এগিয়ে যায় মেকাপ রুমের দিকে। আবার কাউকে দেখে ভয়ে ভয়ে দ্রুত ফিরে আসে গাছের তলায়। সময় বয়ে যায়। ফাস্ট ফরোয়ার্ড শেষ হয় ফারদিন একাত্তর সালের গ্রাম্য যুবকের সাজে লুঙ্গি, স্যান্ডো গেঞ্জি পরে গলায় গামছা ঝুলিয়ে মেকাপ রুমের দরজায় এসে দাঁড়ালে। তার চুলের সাজ বদলে গেছে। দরজায় দাঁড়িয়ে শুট্যিং জোনের এদিক-ওদিক দেখে সে। হুরমতি অবাক চোখে ফারদিনকে দেখতে দেখতে উঠে দাঁড়ায়। অবাক ভঙ্গিতেই মেকাপ রুমের দিকে এগোয় সে। ফারদিন শুট্যিং জোনের দিকে পা বাড়াতে গেলে হুরমতি দ্রুত এসে দাঁড়ায় তার সামনে। অবিশ্বাসের দৃষ্টি তার চোখে। ফারদিন প্রশ্নের চোখে তাকায় তার দিকে। ডিরেক্টরের কণ্ঠ ওভারল্যাপ করে তার মুখের উপর–

ডিরেক্টর : (অফভয়েস)এ্যাকশান।

ফিল গুড মিউজিকে দু’জনকে কেন্দ্রে রেখে ক্যামেরা হাফ সার্কেলে ঘোরে। হুরমতির পেছন থেকে ঘুরে ক্যামেরা ফারদিনকে দেখতে দেখতে ফারদিনের পেছন থেকে ঘুরে আসলে দেখা যায় হুরমতির স্থানে হুরমতির সাজে দাঁড়িয়ে আছে সারাহ।

 

এরপর ফিল গুড মিউজিকেই কয়েকটা মন্তাজ শটে দেখা যায় (শটগুলিতে একাত্তর সালের গ্রাম্য আবহ থাকতে হবে। এবং পোশাকও ওই সময়কার মতো হবে।)

 

দৃশ্য ৫ক

গ্রামের মেঠো পথ। দিন।

সারাহ, জন বান্ধবী।

গ্রামের মেঠো পথ ধরে বান্ধবীদের সাথে মজা করতে করতে যাচ্ছে হুরমতির সাজে থাকা সারাহ। দূর থেকে তাকে দেখে মুগ্ধ হাসুর সাজে থাকা ফারদিন।

 

দৃশ্য ৫খ

গ্রামে বাগান। দিন।

সারাহ, ফারদিন।

একা যেতে থাকা হুরমতির সামনে বাঘের মতো হালুম করে লাফিয়ে পড়ছে হাসু। হুরমতি প্রথমে ভয় পেলেও পরে রেগে যাচ্ছে।

 

দৃশ্য ৫গ

গ্রামে চাষের জমি। দিন।

সারাহ, ফারদিন, অন্যান্য।

জমিতে কাজ করছে হাসু। চুপি চুপি এসে জমির পাশে পড়ে থাকা হাসুর খাবারে অনেক করে লবণ ঢেলে দিচ্ছে হুরমতি। তারপর আড়ালে লুকিয়ে দেখছে। হাসু খেতে বসে খাবার মুখে তুলতেই নাস্তানাবুদ। হাসিতে ভেঙে পড়ছে হুরমতি। সেটা দেখে মুগ্ধ হচ্ছে হাসু।

 

দৃশ্য ৫ঘ

গ্রামে পুকুর পাড়। রাত।

সারাহ, ফারদিন, মুরুব্বি মহিলা।

রাতে পুকুর পাড়ে দাঁড়ানো হাসু কারো জন্য অপেক্ষা করছে। হুরমতি লুকিয়ে দেখা করতে আসছে তার সাথে। দু’জন হাতে হাত ধরে কথা বলছে। একজন মুরুব্বিমতো মহিলা চলে আসছে। হুরমতি ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে। মহিলা হাসুর কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে।

 

দৃশ্য ৫ঙ

গ্রামে কোন বাড়ির উঠান। দিন।

ফারদিন, সারাহ, অন্যান্য।

একটা বাড়ির উঠানে বিয়ের কথাবার্তা বলছে দুই পক্ষ। হাসু একপাশে লাজুকমুখে মাথা নিচু করে আছে। ঘরের জানালা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখছে আর কথা শুনছে হুরমতি।

 

দৃশ্য ৫চ

হাসুদের বাড়ির দাওয়া। দিন।

ফারদিন, মুরুব্বি একজন।

বাড়ির দাওয়ায় বসে একজন মুরুব্বি রেডিও শুনছে। রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ শোনা যায়–

বঙ্গবন্ধু : (অফভয়েস) এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম  স্বাধীনতার সংগ্রাম।

হাসু এসে বসে তার পাশে।ফিল গুড মিউজিক টেনশনের মিউজিকে বদলে যায়

 

দৃশ্য ৫ছ

পুকুর পাড়। রাত।

সারাহ, ফারদিন, দুজন বন্ধু।

রাতে পুকুর পাড়ে কান্নারত হুরমতির কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে হাসু। বন্ধুরা কেউ এসে পড়ছে কি না দেখতে দেখতে আড়াল থেকে ডাকে তাকে। হাসু চলে যায়। হুরমতি কাঁদতে থাকে।

 

দৃশ্য ৫জ

হুরমতির ঘর। দিন।

সারাহ, জন রাজাকার, জন পাকিস্তানী সেনা।

ঘরের ভেতর ভয়ে ভয়ে বসে আছে সারাহ। দড়াম করে খুলে যায় ঘরের দরজা। দু’জন রাজাকারের সাথে একজন পাকিস্তানী সেনা ঘরে ঢোকে। হুরমতির হাত ধরে টানতে শুরু করে একজন রাজাকার। হুরমতি খিলখিল করে হেসে ওঠে। ডিরেক্টরের ভয়েস ওভারল্যাপ করে হুরমতির হাস্যরত মুখের উপর–

ডিরেক্টর : (অফভয়েস) কাট!

থেমে যায় শুট্যিং। রাজাকারের গেটাপে থাকা অভিনেতা হাস্যরত হুরমতির সাজে থাকা সারাহর হাত ছেড়ে দেয়। ডিরেক্টর এসে দাঁড়ায় সারাহর সামনে। সারাহ হেসেই চলেছে। ডিরেক্টর রাগত স্বরে বলে–

ডিরেক্টর : কী হচ্ছে সারাহ?

সারাহ : সুড়সুড়ি লাগে তো!

ডিরেক্টর : এক মিনিট সময় দিলাম.. তোমার ভেতরে যত হাসি আছে সব বের করে দিয়ে ক্যারেক্টারে আসো। আবার যাবো।

সারাহ হাসতে হাসতেই হ্যাঁ-সুচক মাথা দোলায়। ডিরেক্টর ঘুরে গজগজ করতে করতে ঘরের বাইরে চলে আসে। দাওয়ায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায়। বড় করে টান দিয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। তার চোখে পড়ে আড়াল থেকে উৎসুক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে হুরমতি। চোখ চোখ পড়তেই হুরমতি সরে যায়। ডিরেক্টর বড় করে একটা দম ছেড়ে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে ঘরে গিয়ে ঢোকে। ডিরেক্টর ঘরে ঢুকে যেতেই আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে হুরমতি, অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে ঘরটার দিকে। ঘরের ভেতর থেকে ডিরেক্টরের কণ্ঠ ভেসে আসে–

ডিরেক্টর : (অফভয়েস) রোল। ক্যামেরা। এ্যাকশান।

ঘরের ভেতর থেকে আবার সারাহর হাসির শব্দ ভেসে আসে। সাথে ডিরেক্টরের কণ্ঠ–

ডিরেক্টর : (অফভয়েস) কাট!আবার যাবো সারাহ। এবার টেক ওকে করো। এ্যাকশান।

সারাহ হাসির শব্দ। ডিরেক্টরের রাগত কণ্ঠ শোনা যায়–

ডিরেক্টর : (অফভয়েস) কাট!ওর কোন কথা শুনবে না। চুল ধরে টেনে ঘরের বাইরে নেবে। এ্যাকশান।

চুল ধরে সারাহকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে আসে এক রাজাকার। সারাহ কাতরাচ্ছে। তার পেছনে আরেক রাজাকার এবং পাকিস্তানী সেনাটা। আরেকপাশ দিয়ে ট্রলি করে বের হয় ক্যামেরা। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে আছে ডিরেক্টর। সারাহ জোরে চিৎকার করে বলে–

সারাহ : ছাড়েন! ব্যথা লাগছে!

ডিরেক্টর :  কাট!

থেমে যায় শুট্যিং। সারাহ কাঁদতে কাঁদতে ডিরেক্টরকে তীব্র স্বরে বলে–

সারাহ : এই সাহস আপনার হলো কী করে? চুল ধরে টেনে আনতে বলেন!

ডিরেক্টরও রাগত স্বরে বলে–

ডিরেক্টর : একাত্তরে এমনই করতো ওরা।

সারাহ : গোল্লায় যাক আপনার একাত্তর! আমি শিল্পী সমিতিতে আপনার নামে কমপ্লেইন করবো! তারপর দেখবো আপনি কী করে কাজ করেন!

বলেই ঘুরে জোরে হাঁটা ধরে সারাহ। ডিরেক্টর হতাশ চোখে তাকে দেখছে। এই অবস্থায় কেউ একজন তার জামার প্রান্ত ধরে টান দেয়। ডিরেক্টর তাকিয়ে দেখে হুরমতি। ডিরেক্টর তাকাতেই সে ফিস ফিস করে বলে–

হুরমতি : ও বাজান, তহন কেউ কাড কইলো না ক্যান?

ডিরেক্টর : কী!

হুরমতি : কেউ কাড কয় নাই ক্যান? তহন কেউ কাড কয় নাই ক্যান?

ডিরেক্টর : শোনেন.. আপনি..

এডি এবং স্পটবয় এসে ধরে সরাতে চায় হুরমতিকে। কিন্তু তার এসব কোন দিকেই কোন খেয়াল নেই। সে  কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলছে–

হুরমতি : কেউ কাড কয় নাই ক্যান.. ক্যান কয় নাই কেউ!

চিৎকার করে এসব বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে হুরমতি। তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে সবাই। টপ শটে দেখা যায় হুরমতি মাটিতে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে সমানে বলে চলেছে–

হুরমতি : কাড কয় নাই ক্যান!

তাকে ঘিরে আছে বিহ্বল সবাই।

এন্ডিং টাইটেল যেতে থাকে।

 

সর্বস্বত্ব লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *